দুর্ভাগ্যক্রমে, বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে ইতিহাসের নির্দিষ্ট সত্যগুলোকে বিকৃত করার একটি সুপরিকল্পিত মহড়া দেখা গেছে। যার ধারাবাহিকতায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার এবং জেড ফোর্সের অধিনায়ক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে নিয়ে কুৎসিত মিথ্যাচার, প্রপাগান্ডা এবং চরিত্রহননের রাজনীতি করা হয়েছে। এর আগের ইতিহাসের চাক্ষুষ স্বাক্ষী না হওয়ায় বা ব্যক্তিগত অবজারভেশন না থাকায় তা এখানে আলোচনা করছি না। তা নিয়ে অন্যদের আলোচনা রয়েছে।
আমরা দেখেছি, পাঠ্যপুস্তক থেকে রাজনৈতিক প্রোগ্রাম, সবজায়গায় বিদ্বেষের সুরে গান গাওয়া হয়েছে। একটি শিশুর মস্তিষ্কেও ‘বঙ্গবন্ধু বনাম জিয়া” বাইনারি প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হয়েছে। যদিও হিতে বিপরীত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তো তৈরি হয়ই নি, বরং, অতিরিক্ত চাপাচাপির তিক্ততা প্রজন্মকে গ্রাস করেছে, এটাই হয়তো বাড়াবাড়ির পরিণতি। আমার একারণেই মনে হয় যে রাজনৈতিক ধর্মকে কখনোই স্পিরিচুয়াল রিলেজিয়নের পর্যায়ে নেয়া সম্ভব না। কারণ, ধর্ম আসে এমন একটা উৎস থেকে, যার সাথে রাজনৈতিক ধর্মের ডিসকোর্সের কোনো সম্পর্ক নাই। রাজনীতিতে আছে লোভ, ক্ষমতা, লালসা আর ভোগের কথা। আর ধর্ম আমাদের এসব নিয়ন্ত্রণের শিক্ষা দেয়।
যাই হোক, জ্ঞানের অন্বেষক এবং একজন গবেষক হিসেবে যখন কেউ দলীয় চশমা খুলে ঐতিহাসিক নথিপত্র, বৈশ্বিক গণমাধ্যম এবং সমসাময়িক দলিলপত্র বিশ্লেষণ করেন, তখন এই প্রপাগান্ডাগুলো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। আর ইতিহাসের এক ভারসাম্যপূর্ণ রূপ উন্মোচিত হয় আমাদের সামনে।
সংকটকালে রাষ্ট্রদর্শন: বাকশালের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
শহীদ জিয়ার শাসনামলকে বোঝার আগে তার ঠিক পূর্ববর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতাকে একদলীয় স্বৈরতন্ত্র হিসেবে লঘু করে দেখার সুযোগ নেই। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে প্রবর্তিত ‘বাকশাল’ (বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ) শাসনব্যবস্থাকে তৎকালীন বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চরম সংকটের আলোকে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও দর্শনের গভীরতম অধ্যায়গুলো ঘাঁটলে দেখা যায়, সব সময় এবং সব পরিস্থিতিতে ‘পশ্চিমা’ ঘরানার বহুদলীয় উদারপন্থী গণতন্ত্র কার্যকর নাও হতে পারে। বিশেষ করে একটি সদ্য স্বাধীন, যুদ্ধবিধ্বস্ত এবং চরম অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রাষ্ট্রে শৃঙ্খলা ফেরাতে ‘কঠোর শাসন’ বা ‘জাতীয় ঐক্য’ একটি প্রয়োজনীয় হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়।
ধ্রুপদী রাজনৈতিক দর্শনে প্লেটো তাঁর রিপাবলিক গ্রন্থে সতর্ক করেছিলেন যে, একটি নতুন ও অস্থিতিশীল সমাজে অনিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতা শেষ পর্যন্ত অরাজকতা এবং পরবর্তীতে স্বৈরতন্ত্রে রূপ নেয় (Plato, trans. 1991)। প্লেটোর মতে, রাষ্ট্রের ক্রান্তিলগ্নে সাধারণ মানুষের খেয়ালখুশির রাজনীতির চেয়ে প্রাজ্ঞ নেতৃত্বের সুদৃঢ় শাসন বেশি কার্যকর। একইভাবে এরিস্টটল তাঁর পলিটিক্স গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, কোনো শাসনব্যবস্থাই পরম নয়; স্থান-কাল-পাত্রভেদে সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষার্থে শাসনের রূপ পরিবর্তিত হতে পারে (Aristotle, trans. 1998)। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে তখন একদিকে ছিল দুর্ভিক্ষ, অন্যদিকে গোপন চরমপন্থী দলগুলোর সশস্ত্র তৎপরতা। এমন এক চরম পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের অখণ্ডতা রক্ষা এবং একটি বৈপ্লবিক রূপান্তরের জন্য ‘এন্ড জাস্টিফাইস দ্য মিনস’ (উদ্দেশ্যই উপায়ের যৌক্তিকতা প্রমাণ করে) নীতিটি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছিল।
মুসলিম দার্শনিক আল-ফারাবি তাঁর আরা আহল আল-মাদিনা আল-ফাদিলা গ্রন্থে একটি আদর্শ রাষ্ট্র গঠনের জন্য একজন প্রাজ্ঞ, দূরদর্শী এবং একক নেতার অপরিহার্যতার কথা বলেছেন, যিনি সমাজকে অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা থেকে রক্ষা করে একক লক্ষ্যে চালিত করবেন (Al-Farabi, trans. 1985)। কনজারভেটিভ দর্শনের জনক এডমন্ড বার্ক তাঁর রিফ্লেকশন্স অন দ্য রেভল্যুশন ইন ফ্রান্স গ্রন্থে যেমনটি জোর দিয়েছিলেন যে, একটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করা যেকোনো বিমূর্ত গণতান্ত্রিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ (Burke, 1790)। ফলে, সমসাময়িক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তের মুখে রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখার এক চরম রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা থেকেই তৎকালীন নেতৃত্ব বাকশালের দিকে ঝুঁকেছিল বলে আমি বিশ্বাস করতে চাই (হিস্টরিকাল এমপ্যাথি)। যা ছিল মূলত ঔপনিবেশিক আমলাতান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে শোষিত মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করার একটি জাতীয় প্ল্যাটফর্ম (Islam, 2014)। কিন্তু, দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের বেলায় এই বাকশালও কার্যকর হয় নি। অভ্যন্তরীন কোন্দল, শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত ঐতিহাসিক দুর্বলতা, ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ, অস্থিতিশীলতা, নিয়ন্ত্রণহীনতা এবং ভূ-রাজনৈতিকভাবে ব্যর্থ হওয়ায় দেশ আরও অরাজকতার দিকে যেতে থাকে।
মিথ্যাচার: "জিয়াউর রহমান পাকিস্তানের চর বা এজেন্ট ছিলেন"
আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে দলীয় বুদ্ধিজীবীরা প্রায়ই দাবি করতেন যে, জিয়াউর রহমান আসলে ছদ্মবেশে পাকিস্তানের হয়ে কাজ করেছিলেন এবং তিনি ছিলেন ‘পাকিস্তানি এজেন্ট’।
এই দাবিটি ইতিহাসের সবচেয়ে হাস্যকর ও স্ববিরোধী প্রপাগান্ডা। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অপারেশন সার্চলাইটের নামে ঢাকাসহ সারা দেশে গণহত্যা শুরু করে, তখন চট্টগ্রামের সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাস করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে প্রথম সশস্ত্র বিদ্রোহ করেছিলেন তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান (Mascarenhas, 1986)। শুধু তা-ই নয়, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকিস্তান সামরিক আদালত জিয়াউর রহমানের অনুপস্থিতিতে তাঁর বিচার করে এবং তাঁকে ‘দেশদ্রোহী’ ঘোষণা করে তাঁর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেয় (Lifschultz, 1979)।
১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার যখন বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য খেতাব ঘোষণা করে, তখন খোদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারই জিয়াউর রহমানকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সামরিক পদক ‘বীর উত্তম’-এ ভূষিত করে (Ministry of Liberation War Affairs, 2004)। শেখ মুজিব সরকার যদি তাঁকে পাকিস্তানি চর মনে করতেন, তবে এই রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেওয়া কখনো সম্ভব হতো না।
শুধু খেতাব প্রদানই নয়, জিয়াউর রহমানের সামরিক কর্মজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদোন্নতিগুলো এসেছিল বঙ্গবন্ধুর সরাসরি স্বাক্ষরে। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় জিয়াউর রহমানকে কর্নেল পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এর ঠিক এক বছরের মাথায়, ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারই তাঁকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এবং পরবর্তীতে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত করে। ১৯৭৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে যখন সেনাবাহিনীতে উপ-সেনাপ্রধান বা ডেপুটি চিফ অব আর্মি স্টাফের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত পদ তৈরি করা হয়, তখন বঙ্গবন্ধু নিজে জিয়াউর রহমানকে সেই পদে নিয়োগ দেন (Maniruzzaman, 1980)। বঙ্গবন্ধুর এই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলোই প্রমাণ করে যে তিনি জিয়াউর রহমানের পেশাদারিত্ব ও দেশপ্রেমের ওপর কতটা আস্থা রাখতেন।
"অনিচ্ছাকৃত পাঠক" ন্যারেটিভ বনাম সম্মুখ সমরের বীরত্ব
আওয়ামী আমলের প্রপাগান্ডায় দাবি করা হতো যে জিয়াউর রহমান কোনো বীরত্ব দেখাননি। তিনি কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে শুধু একজন 'পাঠক' বা অ্যানাউন্সর ছিলেন এবং পরিস্থিতির কারণে চব্বিশ ঘণ্টার জন্য তাঁকে সামনে আসতে হয়।
ঐতিহাসিকভাবে মেজর জিয়ার ২৬ ও ২৭ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণাটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। এই ঘোষণা ছিল একটি অবরুদ্ধ জাতির জন্য মনস্তাত্ত্বিক টার্নিং পয়েন্ট। এমন কঠিন সময়ে একজন সামরিক কর্মকর্তার মুখে স্বাধীনতার ঘোষণা তৎকালীন সময়ে যুদ্ধের মাঠের সৈনিক এবং সাধারণ মানুষকে যে বিপুল সাহস জুগিয়েছিল, তা সমসাময়িক বিশ্ব গণমাধ্যমে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে প্রচারিত হয় (Anisuzzaman, 2012)।
এর চেয়েও বড় কথা, জিয়াউর রহমান শুধু ঘোষণা দিয়েই বসে ছিলেন না। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের প্রথম নিয়মিত ব্রিগেড 'জেড ফোর্স' (Z Force)-এর অধিনায়ক। তাঁর অধীনে রণাঙ্গনে নিয়মিত এবং গেরিলা বাহিনী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে একের পর এক সফল ও সম্মুখ সমরে অংশ নেয় (Ministry of Liberation War Affairs, 2004)। রৌমারী মুক্তাঞ্চল রক্ষা, বাহাদুরাবাদ ঘাটের যুদ্ধসহ বহু রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সরাসরি পরিকল্পনাকারী ও নেতৃত্বদাতা ছিলেন তিনি। যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর সাহসিকতা ও দক্ষতার বিবরণ খোদ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র এবং সমসাময়িক মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিকথায় স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ আছে।
"বঙ্গবন্ধু হত্যার মাস্টারমাইন্ড" প্রপাগান্ডা ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা
বিগত সরকারের আমলে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল ও ইনডেমনিটি নাটকের মাধ্যমে পলিটিক্যাল ন্যারেটিভ তৈরি করা হয়েছিল যে, ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পেছনে জিয়াউর রহমানই মূল সুতা নাড়িয়েছিলেন।
বাস্তবতা হলো, ১৫ই আগস্টের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের সময় জিয়াউর রহমান ছিলেন সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান। সামরিক চেইন অব কমান্ড অনুযায়ী, কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার বা ফোর্স মুভমেন্টের আদেশ দেওয়ার একক এখতিয়ার তাঁর ছিল না। তা ছিল তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল সফিউল্লাহর হাতে। হত্যাকাণ্ডের পর খুনি ফারুক-রশীদ চক্র কাকে দেশের রাষ্ট্রপতি বানিয়েছিল? তারা আওয়ামী লীগেরই অন্যতম শীর্ষ নেতা খন্দকার মোশতাক আহমেদকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে এবং মোশতাকের অধীনেই আওয়ামী লীগের তৎকালীন প্রায় পুরো মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণ করে (Mascarenhas, 1986)। জিয়াউর রহমান সেই সরকারের প্রধান ছিলেন না।
প্রখ্যাত মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজের অনুসন্ধানী গবেষণায় দেখা যায়, ১৫ই আগস্টের পটপরিবর্তনের পেছনে একটি দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক চক্রান্ত কাজ করছিল। যেখানে খন্দকার মোশতাক এবং মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-র (CIA) ভূমিকা থাকতে পারে (Lifschultz, 1979)। জিয়াউর রহমান একজন পেশাদার সৈনিক হিসেবে এই রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অংশ ছিলেন না, বরং নভেম্বরের ৭ তারিখের সিপাহী-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে এক চরম বিশৃঙ্খল ও নেতৃত্বহীন অবস্থায় দেশের জনগণ ও সাধারণ সৈনিকরা তাঁকে অবরুদ্ধ দশা থেকে মুক্ত করে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে।
তাছাড়া, পচাত্তরের পটপরিবর্তনের পর জিয়াউর রহমান যখন রাষ্ট্রক্ষমতায় আসেন, তখন রাষ্ট্রীয়ভাবে বঙ্গবন্ধুকে মুছে ফেলার কোনো চেষ্টা তিনি করেননি। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে জিয়াউর রহমান বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে এবং দেশীয় ভাষণে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর অবিসংবাদিত নেতৃত্বকে অত্যন্ত সম্মানের সাথে স্মরণ করতেন। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সরকারি তথ্য অধিদপ্তর থেকে প্রকাশিত 'বাংলাদেশ' নামক বার্ষিক বই ও তথ্যপুস্তিকাগুলোতে শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি ও আন্দোলনের মূল নেতা হিসেবে যথাযথ মর্যাদা দিয়ে তাঁর ছবি ও জীবনী অন্তর্ভুক্ত রাখা হয়েছিল। জিয়াউর রহমান তাঁর ব্যক্তিগত কথাবার্তা ও দাপ্তরিক আচরণে কখনো বঙ্গবন্ধুর প্রতি অসম্মানসূচক কোনো শব্দ ব্যবহার করেননি। তিনি সব সময় বিশ্বাস করতেন যে রাজনৈতিক মতভিন্নতা থাকতে পারে, কিন্তু স্বাধীনতা সংগ্রামের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সামরিক কমান্ডের মধ্যকার যে ঐতিহাসিক বন্ধন, তা চিরন্তন।
যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসন ও ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের অপব্যাখ্যা
আওয়ামী লীগ দাবি করত যে, জিয়াউর রহমান দালাল আইন (ইন্ডেমনিটি এন্ড কোলাবোরেটর্স অ্যাক্ট) বাতিল করে একাত্তরের ঘাতক-দালাল ও যুদ্ধাপরাধীদের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করেছিলেন।
১৯৭৩ সালের ৩০শে নভেম্বর শেখ মুজিবুর রহমান নিজেই একটি সাধারণ ক্ষমা (General Amnesty) ঘোষণা করেছিলেন, যার অধীনে দালাল আইনে আটক থাকা একটি বড় অংশের কারাবন্দি (যাঁদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট খুনের মামলা ছিল না) মুক্তি পান (Islam, 2014)। জিয়াউর রহমান ক্ষমতা নেওয়ার পর দেশের রাজনৈতিক অচলাবস্থা দূর করতে এবং বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু করতে সব দলের জন্য রাজনৈতিক দুয়ার উন্মুক্ত করেছিলেন। এটি কোনো নির্দিষ্ট যুদ্ধাপরাধী গোষ্ঠীকে পুনর্বাসন করার জন্য ছিল না, বরং রাষ্ট্রকে একদলীয় শাসনব্যবস্থা থেকে বের করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে আনার রাজনৈতিক কৌশল ছিল (Huq, 1984)। আর বহুল আলোচিত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি (যা ১৫ই আগস্টের খুনিদের সুরক্ষা দিয়েছিল) মূলত জারি করেছিলেন খন্দকার মোশতাক আহমেদ, ১৯৭৫ সালের ২৬শে সেপ্টেম্বর, জিয়াউর রহমান ক্ষমতা গ্রহণের অনেক আগে। পরবর্তীতে সংসদীয় ব্যবস্থায় তা পাস হলেও, তার মূল দায় চাপানো হয়েছিল জিয়ার ওপর। আবারও আসবে হিস্টরিকাল ইমপ্যাথির কথা, আমার আলোচনা বা লেখায় সবার পজিটিভিটিই উঠে আসবে। তাই, এই স্কুল অব থট বিলং করার দায় আমি নিচ্ছি।
তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে সম্পর্ক ও সহাবস্থান
বর্তমান রাজনৈতিক বয়ানে এমন একটি ধারণা তৈরি করা হয়েছে যেন ১৯৭৬ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত জিয়াউর রহমানের শাসনামলে আওয়ামী লীগকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়েছিল। অথচ ঐতিহাসিক সত্য সম্পূর্ণ উল্টো। ১৯৭৫ সালের একদলীয় বাকশাল শাসনের পর জিয়াউর রহমানই দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের দুয়ার উন্মুক্ত করেন। ১৯৭৬ সালে 'পলিটিক্যাল পার্টি রেগুলেশন' বা পিপিআর জারির মাধ্যমে তিনি আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য দলগুলোকে পুনরায় রাজনীতি করার আইনি অধিকার ফিরিয়ে দেন।
তাঁর শাসনামলেই ১৯৭৮ এবং ১৯৭৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ণ স্বাধীনতা নিয়ে অংশগ্রহণ করে এবং সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে (Hasanuzzaman, n.d.)। তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা মালেক উকিল, মহিউদ্দিন আহমেদ এবং জোহরা তাজউদ্দীনের মতো শীর্ষ নেতাদের সাথে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের একটি অত্যন্ত মার্জিত এবং পেশাদার রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল। তিনি বিভিন্ন জাতীয় সংকটে এবং নীতি নির্ধারণী বিষয়ে বিরোধী দলীয় নেতাদের বঙ্গভবনে আমন্ত্রণ জানাতেন এবং তাঁদের মতামত নিতেন। জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন ছিল অন্তর্ভুক্তিমূলক, যেখানে বিরোধী দলকে শত্রু নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার অংশীদার মনে করা হতো।
শেখ হাসিনার স্বদেশে প্রত্যাবর্তন: শহীদ জিয়ার ঐতিহাসিক সবুজ সংকেত
শহীদ জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উদারতা ও মানবিক রাষ্ট্রনায়কোচিত আচরণের সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের অনুমতি ও নিরাপত্তা প্রদান। ১৯৭৫ সালের আগস্টের পর শেখ হাসিনা এবং তাঁর বোন শেখ রেহানা যখন বিদেশে অবরুদ্ধ ও চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছিলেন, তখন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কেবল শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরার বিন্দুমাত্র বাধা দেননি, বরং তিনি রাষ্ট্রীয়ভাবে এই প্রক্রিয়াকে সহজতর করেছিলেন। ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে শেখ হাসিনাকে দলের সভানেত্রী নির্বাচিত করার পর, জিয়াউর রহমান নিজে আওয়ামী লীগ নেতাদের আশ্বস্ত করেছিলেন যে শেখ হাসিনা স্বাধীন নাগরিক হিসেবে যেকোনো সময় দেশে ফিরতে পারবেন এবং রাষ্ট্র তাঁর পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। ১৯৮১ সালের ১৭ই মে শেখ হাসিনা যখন ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণ করেন, তখন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নির্দেশে সেখানে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল, যেন কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে (Ara, 2025)। শুধু তা-ই নয়, ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়িটি এবং বঙ্গবন্ধুর অন্যান্য ব্যক্তিগত সম্পত্তি শেখ হাসিনার কাছে হস্তান্তর করার আইনি প্রক্রিয়াও জিয়াউর রহমানের নির্দেশেই শুরু হয়েছিল।
বিতর্ক ও মূল্যায়ন
ইতিহাসের নির্মম সত্য হলো, ক্ষমতার শীর্ষবিন্দুতে থাকা কোনো শাসকের পথই সম্পূর্ণ নিষ্কণ্টক বা বিতর্কহীন হয় না। জিয়াউর রহমানের শাসনামলেও কিছু রক্তাক্ত সামরিক অভ্যুত্থান এবং তার প্রেক্ষিতে গঠিত সামরিক আদালতের (মার্শাল ল কোর্ট) দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে গভীর রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে, ১৯৭৭ সালের ও পরবর্তী সময়ের বিভিন্ন অভ্যুত্থান দমনের নামে গঠিত ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর বা যাকে অনেক সমালোচক 'জুডিশিয়াল মার্ডার' হিসেবে অভিহিত করেন, তা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি জটিল ও আলোচিত অধ্যায় (Lifschultz, 1979)। আর মানুষ হিসেবে আমরা কেউই ভুলের ঊর্ধ্বে নই। সেই বিষয়টা মাথায় রেখেই আমাদের বিশ্লেষণ করতে হয়।
হিস্টরিকাল ইমপ্যাথি দিয়ে বলতে গেলে সময়টি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক চরম ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, অবিন্যস্ত সামরিক বাহিনী এবং একের পর এক পাল্টা অভ্যুত্থানের (Coup d'état) এক বিশৃঙ্খল কাল (Mascarenhas, 1986)। রাষ্ট্র এবং সামরিক বাহিনীর চেইন অব কমান্ড তখন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। একজন রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তৎকালীন পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর ভেতরের চরম শৃঙ্খলাহীনতা ও নৈরাজ্য দমন এবং রাষ্ট্রের অখণ্ডতা রক্ষা করা তাঁর জন্য এক অস্তিত্বের লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ফলে, অনেক সিদ্ধান্তই হয়তো তৎকালীন সামরিক বিধি ও কঠোর আইনি কাঠামোর মধ্য দিয়ে গেছে, যা কোনো ব্যক্তিগত নিষ্ঠুরতা বা আক্রোশ ছিল না; বরং তৎকালীন বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার স্বার্থে রাষ্ট্র নামক প্রতিষ্ঠানটিকে টিকিয়ে রাখার এক চরম বা অনিবার্য প্রয়াস ছিল (Maniruzzaman, 1980)।
১৯৮১ সালের মে মাসে এক মর্মান্তিক সামরিক অভ্যুত্থানে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে তাঁর জীবনপ্রদীপ নিভে যায়। কিন্তু শেরেবাংলা নগরে তাঁর জানাজায় অংশ নেওয়া লাখো মানুষের জনসমুদ্র প্রমাণ করেছিল, তিনি সাধারণ মানুষের কতটা কাছাকাছি পৌঁছাতে পেরেছিলেন। যদিও সবক্ষেত্রে জানাযা বা সৎকারে মানুষের সমবেত হওয়া কিংবা পপুলিজম, বা জনপ্রিয়তাই কোনো মানুষের সফলতার মানদণ্ড না।
রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সম্পৃতির গুরুত্ব
ইতিহাসের এই দীর্ঘ ও জটিল নদীপথ আমাদের আত্মোপলব্ধির দাবি এবং সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। একটি রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রার জন্য কোনো একক শাসনামলকে সম্পূর্ণ খলনায়ক বা সম্পূর্ণ ত্রাতা হিসেবে চিত্রায়িত করার সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। পঁচাত্তর-পরবর্তী চরম সামরিক বিশৃঙ্খলার মধ্যে রাষ্ট্রকে রক্ষা করা এবং একটি ধ্বংসপ্রায় অর্থনীতিকে মুক্তবাজারের দিকে ঠেলে দিয়ে পুনর্জীবিত করার ক্ষেত্রে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অবদান যেমন অবিতর্কিত, তেমনি তাঁর পূর্ববর্তী সময়ে রাষ্ট্রকে চরম নৈরাজ্য থেকে বাঁচাতে বাকশাল ব্যবস্থার পেছনেও ছিল সুনির্দিষ্ট তাত্ত্বিক ভিত্তি।
একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য আমাদের এই দুই মহান নেতার ঐতিহাসিক সম্পর্কের গভীরতা, পারস্পরিক প্রাতিষ্ঠানিক শ্রদ্ধা এবং রাজনৈতিক সহাবস্থানের ইতিহাসকে ধারণ করতে হবে। জিয়াউর রহমান কর্তৃক আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনা এবং শেখ হাসিনাকে সসম্মানে দেশে ফেরার সুযোগ করে দেওয়ার যে উদারতা, তা আজ প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ কখনো পরম শত্রু হতে পারে না। অতীত মিথ্যাচারের দেয়াল ভেঙে ইতিহাসের এই অলঙ্ঘনীয় সত্যগুলোকে মেনে নেওয়ার মাধ্যমেই কেবল জাতীয় সংহতি ও রাজনৈতিক সম্প্রীতি অর্জন সম্ভব।
লেখক,
মো. রিদওয়ান আল হাসান
সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত), সাহিত্যনামা
রেফারেন্স
Al-Farabi. (1985). Al-Farabi on the Perfect State: Abu Nasr al-Farabi's Mabadi' Ara' Ahl al-Madina al-Fadila (R. Walzer, Trans.). Oxford University Press.
Anisuzzaman, M. (2012). Creativity, Identity, and Reality: Essays on Bangladesh. Pitambar Publishing.
Ara, M. (2025). “The Real History” - Teaching the 1971 Liberation War in Bangladesh. Journal of Educational Media, Memory, and Society, 17(1), 45-68.
Aristotle. (1998). Politics (C. Reeve, Trans.). Hackett Publishing Company.
Burke, E. (1790). Reflections on the Revolution in France. J. Dodsley.
Hasanuzzaman, A. M. (n.d.). Role Of Opposition In Bangladeshi Politics: An Assessment. Dhaka University Institutional Repository.
Huq, A. F. (1984). The Problem of National Identity in Bangladesh. Journal of Social Studies, 24, 45-63.
Islam, S. (2014). History of Bangladesh (1704-1971) (Vol. 3). Asiatic Society of Bangladesh.
Lifschultz, L. (1979). Bangladesh: The Unfinished Revolution. Zed Press.
Maniruzzaman, T. (1980). The Bangladesh Revolution and Its Aftermath. University Press Limited.
Mascarenhas, A. (1986). Bangladesh: A Legacy of Blood. Hodder & Stoughton.
Ministry of Liberation War Affairs. (2004). History of Bangladesh War of Liberation: Documents (Vols. 9-11). Government of the People's Republic of Bangladesh.
Plato. (1991). The Republic of Plato (A. Bloom, Trans.). Basic Books.
মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন