“…এ অনন্ত চরাচরে স্বর্গমর্ত্য ছেয়ে।সব চেয়ে পুরাতন কথা, সব চেয়েগভীর ক্রন্দন “যেতে নাহি দিব।” হায়,তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়।“-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (যেতে নাহি দিব)
বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন একজন, যাঁকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে সাধারণ মানদণ্ড অকার্যকর হয়ে পড়ে। তিনি ক্ষমতায় ছিলেন। ক্ষমতার বাইরে ছিলেন আরও দীর্ঘ সময়। কিন্তু, উভয় অবস্থানেই তিনি রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। নানান ঘাত-প্রতিঘাত, জেল-জুলুমেও তিনি দেশ ছেড়ে যাননি, সাধারণ জনগণের একটা বড় অংশের সমর্থন পেয়ে গেছেন সবসময়ই। এই উপস্থিতি এবং প্রভাবই তাঁকে অবিসংবাদিত করে তোলে।
১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট অবিভক্ত ভারত উপমহাদেশের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুঁড়ির নয়াবস্তি এলাকায় বেগম খালেদা জিয়ার জন্ম। রাজনীতি তাঁর উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া কোনো পেশা ছিল না। জীবনের শুরুতে তিনি ছিলেন একজন গৃহিণী। এই তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, একারণেই তাঁর রাজনৈতিক উত্থানকে ব্যতিক্রমী বলা যায়।
তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘদিনের। দলীয় সূত্রে জানা যায় তিনি কলেজ পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন। আবার রাজনৈতিক সমালোচকদের একাংশ দাবি করে থাকেন তিনি ম্যাট্রিকুলেশনও (এসএসসি) পাস করেননি। এই বিতর্ক মূলত তাঁকে হেয় করার রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক। কিন্তু, বাস্তবতা হলো খালেদা জিয়া ছিলেন স্বশিক্ষিত। তিনি প্রয়োজনের তাগিদে পড়েছেন। রাজনীতি বোঝার জন্য পড়েছেন। রাষ্ট্রক্ষমতার কাঠামো বোঝার জন্য পড়েছেন। জীবন সম্পর্কে বোঝার জন্য নিজ আগ্রহে পড়াশোনা করেছেন। বাংলা ভাষার পাশাপাশি ইংরেজি ভাষাতেও কূটনৈতিক যোগাযোগে তিনি দক্ষ ছিলেন। এই ধরনের শিক্ষা কোনো সনদের মাধ্যমে যাচাই করা যায় না। আর ‘সুশিক্ষা’ প্রকৃতপক্ষে আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মুখাপেক্ষীও নয়। প্রমথ চৌধুরীর উক্তিই যথার্থ, “সুশিক্ষিত লোক মাত্রই স্বশিক্ষিত কিন্তু স্বশিক্ষিত লোক মাত্রই সুশিক্ষিত নয়।“
বাংলাদেশের রাজনীতিতে তথাকথিত বহু উচ্চশিক্ষিত মানুষ এসেছেন এবং আসছেন, ভবিষ্যতেও আসবেন। কিন্তু সবাই রাষ্ট্রনায়ক হতে পারেননি, পারবেনও না। খালেদা জিয়ার শক্তি ছিল তাঁর বাস্তববোধ। তিনি তত্ত্বের রাজনীতিতে আটকে থাকেননি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন মানুষ কী চায়, পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে, ক্ষমতা কোথায় দাঁড়িয়ে আছে। এই উপলব্ধিই তাঁকে দীর্ঘ সময় টিকিয়ে রেখেছে।
১৯৮১ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর খালেদা জিয়ার জীবনে বড় ধাক্কা আসে। সেই সময় তিনি রাজনীতি থেকে বিরত থেকে বিলাসবহুল জীবন যাপন করতে পারতেন। অনেকেই ভেবেছিলেন তিনি হয়তো রাজনীতিতে আসবেন না। কিন্তু, ধীরে ধীরে তিনি নিজেকে প্রস্তুত করেন। ১৯৮২ সালে যোগ দিয়ে ১৯৮৪ সালে তিনি বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তখন বাংলাদেশ সামরিক শাসনের অধীনে। বিরোধী রাজনীতি ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। এভাবে একজন নারী নেত্রীর বিরোধী রাজনীতিতে এসে সামনে দাঁড়ানো ছিল বিরল ঘটনা।
“আমি মৃত্যু-চেয়ে বড়ো এই শেষ কথা বলেযাব আমি চলে।“-মৃত্যুঞ্জয় (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
খালেদা জিয়া ঝুঁকি নিয়েছিলেন। তিনি আন্দোলনের রাজনীতিতে যুক্ত হন। গ্রেপ্তার হন। রাজপথে থাকেন। তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে একটি সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। এই সময় তাঁর রাজনৈতিক দৃঢ়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি চাপের কাছে নতি স্বীকার করেননি।
১৯৯১ সালে তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হন। বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয়। তাঁর নেতৃত্বেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রপতি শাসন ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় শাসন ব্যবস্থায় ফিরে যায়। এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটি। আজ পর্যন্ত এই ব্যবস্থা বহাল আছে। এই সিদ্ধান্ত তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতার প্রমাণ।
তাঁর শাসনামলে শিক্ষা ও সামাজিক খাতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়। মেয়েদের শিক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। উপবৃত্তি কর্মসূচির মাধ্যমে গ্রামীণ মেয়েদের স্কুলে ধরে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়। উচ্চশিক্ষার ক্রমবর্ধমান চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ১৯৯২ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন প্রবর্তন করেন। এর মাধ্যমে বেসরকারি উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন ও পঠন-পাঠন শুরু করেছিলেন। এছাড়া তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার প্রসারেও তিনি কাজ করেছেন। কৃষি শিক্ষার সহজীকরণ এবং প্রসারেও তাঁর ভূমিকা আছে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। এসব উদ্যোগ তখন হয়তো খুব উচ্চকণ্ঠে প্রচারিত হয়নি। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এগুলো সমাজে গভীর প্রভাব ফেলেছে।
২০০১-২০০৬ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল জটিল। বৈশ্বিক রাজনীতি বদলে যাচ্ছে। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিভাজন তীব্র। সেই বাস্তবতায় সরকার পরিচালনা সহজ ছিল না। তারপরও তিনি প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করেন। তাঁর নেতৃত্বের একটি বৈশিষ্ট্য ছিল কম কথা বলা। তিনি আবেগনির্ভর বক্তা ছিলেন না। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় দ্বিধা করতেন না।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনে বিতর্কের অভাব নেই। দুর্নীতির অভিযোগ আছে। মামলার দীর্ঘ অধ্যায় আছে। কারাবাসের অভিজ্ঞতা আছে। এসব বাস্তবতা অস্বীকার করা যাবে না। এই মামলাগুলোর অনেকগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে তাঁর সমর্থকরা মনে করেন। এত চাপের মধ্যেও তিনি ভেঙে পড়েননি।
একটি বিষয় খুব কম আলোচিত হয়। খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থেকেও ব্যক্তিগত জাঁকজমক পছন্দ করতেন না। তাঁর জীবনযাপন ছিল তুলনামূলক সংযত। তিনি রাজনীতিতে প্রতিশোধপরায়ণতার সংস্কৃতি পুরোপুরি গ্রহণ করেননি। এই সংযম তাঁকে আলাদা করে।
খালেদা জিয়ার শিক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তোলা সহজ। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক ক্যালিবার অস্বীকার করা কঠিন। তিনি ছিলেন ব্যবহারিক রাজনীতির মানুষ। সময় বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া নেতা। মানুষের ভাষায় কথা বলা রাজনীতিক। দেশ থেকে পালিয়ে না যাওয়া রাজনীতিবিদ, দেশের মাটিতে মৃত্যুবরণ করা বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ। স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচ ব্যক্তির (শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান, এইচ এম এরশাদ, শেখ হাসিনা এবং বেগম খালেদা জিয়া) মধ্যে
তিনিই 'স্বৈরাচার' ট্যাগ থেকে দূরে থাকতে পেরেছেন। সমালোচনা কিংবা বিতর্ক থাকলেও কেউ তাঁকে 'ফ্যাসিস্ট' কিংবা 'অগণতান্ত্রিক' মানসিকতার বলে আখ্যা দিতে পারবে না। এই কারণেই তিনি অবিসংবাদিত। যদিও, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা গ্রহণ নিয়ে অনেকেই নেতিবাচক মন্তব্য এবং বিতর্ক করে থাকেন, কিন্তু, বেগম খালেদা জিয়া এই গণতান্ত্রিক এবং উদার মানসিকতা শহীদ জিয়া থেকেই পেয়েছিলেন বলে জানা যায়। শহীদ জিয়াউর রহমানকে তাই এদেশের গণতন্ত্রের ত্রাণকর্তা, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা এবং বেগম খালেদা জিয়াকে 'গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতীক' বলেই আমি মনে করি।
তিনি নিখুঁত ছিলেন কি না তা ইতিহাস মূল্যায়ন করবে, কিন্তু, তিনি যে গুরুত্বপূর্ণ এবং অপরিহার্য ছিলেন, সে বিষয়ে কোনো বিতর্ক নেই। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাস তাঁর নাম ছাড়া অসম্পূর্ণ হয়েই থাকবে।
তথ্যসূত্র
ডেইলি ইনকিলাব। https://dailyinqilab.com/national/news/847602
এনটিভি বাংলাদেশ। https://www.ntvbd.com/bangladesh/news-1669745
সাহিত্যনামা। https://www.sahityonama.com/2025/12/blog-post_30.html
মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন