বাংলা নববর্ষে হালখাতা,বঙ্গাব্দ সূচনার অবিচ্ছেদ্য ইতিহাস।

বাংলা নববর্ষে হালখাতা,বঙ্গাব্দ সূচনার অবিচ্ছেদ্য ইতিহাস।

পহেলা বৈশাখ, বাংলা নববর্ষ, বাংলা সংস্কৃতি উদযাপনের দিন। ১৪৩২ বঙ্গাব্দ শেষ হয়ে ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ শুরু। পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ বাঙালির এক অনন্য উৎসব, যার ঐতিহ্য সুপ্রাচীন ও গৌরবমণ্ডিত। কালের যাত্রাপথ ধরে বাংলা নববর্ষের উদযাপন রীতিতে বিভিন্ন পালাবদল ঘটেছে, এবং সময়ে সময়ে তা বিভিন্ন মাত্রিকতা অর্জন করেছে।আবহমান বাংলার চিরায়ত সংস্কৃতি পহেলা বৈশাখের অন্যতম অনুষঙ্গ ‘হালখাতা’। হালখাতা বললেই চোখে ভাসে লাল মলাটের 'সাল খাতা'। ঐতিহাসিকভাবেই এই লাল খাতাটি ব্যবসায়ীদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 

বাংলা সনের সূচনার ইতিহাস ঘিরে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। বাংলা একাডেমি প্রকাশিত ‘বাংলাদেশে উৎসব, নববর্ষ’, সাদ উর রহমানের ‘উৎসবের ঢাকা’ বই এবং ঢাকা কেন্দ্রের তথ্য অনুসারে, মোগল সম্রাট আকবরের নির্দেশনা অনুযায়ী বঙ্গাব্দের সূচনা হয়েছিল। তৎকালীন মোগল আমলে হিজরি বর্ষপঞ্জি অনুসরণ করে প্রজাদের নিকট থেকে খাজনা আদায় করা হত। চন্দ্র মাসের হিসেবে চলা হিজরি বর্ষপঞ্জির কারণে এই অঞ্চলে প্রজাদের খাজনা পরিশোধে অসুবিধা হতো। এই কারণে মোগল সম্রাট আকবর বিখ্যাত জ্যোতিষবিদ আমির ফতেহউল্লাহ সিরাজিকে বর্ষপঞ্জি সংস্কারের দায়িত্ব দেন। এরপর আমির ফতেহউল্লাহ সিরাজি হিন্দু পঞ্জিকা ও হিজরি পঞ্জিকা বিশ্লেষণ করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম নির্ধারণ করেন। অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে, ১৫৫৬ সালে মোগল সম্রাট আকবর বাংলা সন চালু করেন। এটি কৃষকদের কাছে ‘ফসলি সন’ নামে পরিচিত ছিল, যা পরবর্তীতে ‘বাংলা সন’ বা ‘বঙ্গাব্দ’ নামে প্রচলিত হয়ে ওঠে।

বাংলা সন চালুর ধারাবাহিকতায়, চৈত্র মাসের শেষ দিন চৈত্রসংক্রান্তিতে জমিদারের প্রতিনিধিরা প্রজাদের নিকট থেকে খাজনা আদায় করতেন, এবং পরবর্তী বছরের প্রথম দিন পয়লা বৈশাখে জমিদাররা প্রজাদের মিষ্টি, মিষ্টান্ন, পান-সুপারি দিয়ে আপ্যায়ন করতেন। নববর্ষের হালখাতায় পুরনো বছরের খাজনা আদায়ের হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন করে হিসেবের নতুন খাতা খোলা হত। একসময় বাংলার নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ একটি নতুন রীতি প্রচলন করেন, যেটি একসময় ‘পুণ্যাহ‍‍’ হিসেবে পরিচিত ছিল। কালের পরিক্রমায় ‘পুণ্যাহ‍‍’ উৎসব হারিয়েগেলেও হালখাতা এখনও স্বমহিমায় টিকে রয়েছে।

তবে নবাব অথবা, জমিদারদের খাজনা পরিশোধ করার পর নতুন হিসেবের সূচনার পাশাপাশি হালখাতার আলাদা একটি ইতিহাস রয়েছে। ‘হাল’ শব্দটি সংস্কৃত এবং ফারসি– উভয় ভাষা থেকে আসলেও অর্থগত দিক থেকে এর ভিন্নতা রয়েছে। সংস্কৃত শব্দ ‍‍‘হাল‍‍’ এর অর্থ ‘লাঙল‍‍’। অন্যদিকে, ফারসি শব্দ ‍‍‘হাল‍‍’ এর অর্থ হচ্ছে ‍‍‘নতুন‍‍’। বাঙালি সমাজে ‘হালখাতা‍‍’র ক্ষেত্রে এই দুটো অর্থই প্রসঙ্গিক। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, হালখাতার ইতিহাস কৃষিপ্রথার সাথে সম্পর্কিত। কারণ, কৃষিপ্রথার সূচনার পর হাল বা লাঙল দিয়ে বিভিন্ন কৃষিজাত পণ্য উৎপাদনের পর সেই পণ্য বিনিময়ের হিসেব একটি বিশেষ খাতায় লিখে রাখা হতো, যেটি ‍‍‘হালখাতা‍’ হিসেবে পরিচিত ছিল।

‘হালখাতা’ উপলক্ষে ব্যবসায়ীরা ঝালর কাটা লাল-নীল-সবুজ-বেগুনি কাগজ দিয়ে দোকান সাজাতেন। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সামনে ‘শুভ নববর্ষ, শুভ হালখাতা’ লেখা ব্যানার-ফেস্টুন ঝুলিয়ে বর্ণিল রূপে রাঙিয়ে তোলা হতো। কিছু কিছু দোকানে ধূপধুনা জ্বালানো হতো। এ সময় গ্রাহক-খরিদ্দারদের মিষ্টিমুখ করানো হতো, এবং হাসি-ঠাট্টা, গল্পগুজবের মধ্যে বকেয়া আদায়ের পাশাপাশি উৎসব আয়োজন– দুটোই সমান তালে চলত। এছাড়াও আগত অতিথিদের জন্য পান-সুপারি, মিষ্টি এবং উপহারের বন্দোবস্ত থাকত। 

বর্তমানে ‘হালখাতা’ উৎসব আর তেমন সাড়ম্বরে উদযাপিত হয় না। সামাজিক বিবর্তনে কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সমাজ এখন নগরভিত্তিক সমাজে রূপান্তরিত হচ্ছে। যান্ত্রিকতার এই যুগে প্রযুক্তির কল্যাণে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমেও কেউ কেউ পাওনা পরিশোধ করছেন। তবে রং ফিকে হয়ে এলেও দেশের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে  পুরান ঢাকার ব্যবসায়ী মহলে, এখনও এই উৎসবের প্রচলন রয়েছে।

মন্তব্যসমূহ (০)


Lost Password