টেপা পুতুলের গল্প

টেপা পুতুলের গল্প

বাংলার কুমার সম্প্রদায়ের লোকেরা নরম এঁটেল মাটি দিয়ে হাতের নৈপুণ্য ও কারিগরি জ্ঞানের মাধ্যমে আঙুল দিয়ে টিপে টিপে এই পুতুল তৈরি করা হতো। কুমাররা হাত দিয়ে টিপে টিপে বানাত বলে এই পুতুলের নামকরণ হয় টেপা পুতুল। অর্থাৎ মাটিতে দক্ষ আঙুলের চাপ দিয়ে দিয়ে আকার দেওয়া হয় টেপাপুতুলের।

নির্দিষ্ট কোনো ছাঁচ বা ফর্মা ব্যবহার না করে সম্পূর্ণ হাতের আঙুলের কারিশমায় এ পুতুল তৈরি হয়। এটিতে কোনো রঙের ব্যবহার ছিল না।  তারপর রোদে শুকিয়ে তা আগুনে পোড়ালেই হয়ে যেত টেপাপুতুল। বেশিরভাগ নারীরাই টেপাপুতুল বানানোতে সিদ্ধহস্ত ছিল। পরে জীবিকার তাগিদে পুরুষরা টেপাপুতুল বানাতে শুরু করে। মাটির পুতুল বাঙালির অন্যতম প্রাচীন ঘরোয়া শিল্পকর্ম। সুপ্রাচীন কাল থেকে বাংলার ঘরে ঘরে পুতুল তৈরির কথা ইতিহাসে লিপিবদ্ধ আছে।

পুতুল বানানোর উপাদান হলো- পোড়ামাটি, কাঁচামাটি, তালপাতা, তালের আঁটি, নারকেলের ছোবড়া, পাট, গালা, কাপড় ও পিতল। আকৃতি দেওয়া হতো- মনুষ্যমূর্তি, হাতি, ঘোড়া ও বিভিন্ন দেব-দেবীর। পুতুল ব্যবহার হতো বাচ্চাদের খেলনা হিসেবে। গ্রামবাংলার নারীরাই দক্ষ ছিল বেশি টেপাপুতুল বানাতে। এই পুতুল যে কেউ বানাতে পারত না। টেপাপুতুল বানাতে নিজস্ব মেধা ও দক্ষতার প্রয়োজন হয়। মাটির টুকরা নিয়ে হাতের তালু দিয়ে ঘষে ঘষে পুতুলের আকৃতির ওপর কাঠির রেখা টেনে টেনে পুতুলের অলংকার ও পোশাকের চিহ্ন বা আভাস ফুটিয়ে তুলতে হয়। তারপর রোদে শুকাতে হয়। শুকিয়ে গেলে তা আগুনে পোড়াতে হয়। তখন এতে রং দিতে হয়। লালচে খয়েরি, কালো, সাদা-কালো ডোরা প্রভৃতি রং দিয়ে টেপাপুতুল বানাতে হতো। টেপাপুতুল বিভিন্ন ধরনের বানাতো কারিগররা। তার মধ্যে বউ-জামাই, কৃষক, নতুন নথপরা বউ ও বিভিন্ন দেব-দেবীর মুখের অবয়ব দেওয়া পুতুল উল্লেখযোগ্য। বাচ্চারা খেলনা হিসেবে আর বউঝিরা পূজার জন্য কিনত টেপাপুতুল।

কেবল টেপাপুতুল নয়, অন্যান্য সাধারণ মাটির পুতুল তৈরির ইতিহাস অনেক পুরোনো। বাংলার বিভিন্ন জায়গায় খনন কাজ করার সময় বিভিন্ন ডিজাইনের পুতুল পাওয়া যায়। যা প্রাচীন সভ্যতা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে পরিচয় বহন করে। আধুনিক যুগে বর্তমান প্রজন্ম ইন্টারনেটের সুবাদে ক্লাউড কম্পিউটিং-এর বদৌলতে বিশ্ব এনেছে হাতের মুঠোয়। মাটির পুতুলই হোক কিংবা পরবর্তী আধুনিক সংস্করণই হোক ব্যাটারিচালিত পুতুল সুইচ দিলেই গেয়ে ওঠে ‘চলে চাইয়া চাইয়া’ এসবও এখন প্রজন্মের কাছে সেকেলে হয়ে গেছে। সময়ের ব্যবধানে বাংলার মৃৎশিল্পের এক অন্যতম উপাদান টেপা পুতুল আজ হারিয়ে যাচ্ছে। হয়তো আগামী প্রজন্ম এ টেপা পুতুল সম্পর্কে জানবে বইয়ের পাতায়।প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও টেপা পুতুল তৈরির মৃৎশিল্পীদের সুযোগ-সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখা যেতে পারে বাংলার ঐতিহ্য টেপা পুতুল। 

মন্তব্যসমূহ (০)


Lost Password