অবুঝ প্রাণ 'ফোরটিন' এর কান্নার গল্প

অবুঝ প্রাণ 'ফোরটিন' এর কান্নার গল্প

রাত তখন আনুমানিক ২টা। চারপাশ নিঝুম, অন্ধকার। দক্ষিণ ক্যারোলিনিয়ার এক ফাঁকা কৃষিজমির বুক চিরে চলে যাওয়া নির্জন গ্রামীণ রাস্তাটি তখন বৃষ্টিতে ভিজছিল। পেশায় দীর্ঘপথের ট্রাক চালক এক ব্যক্তি নিজের ৩১ বছরের কর্মজীবনে বহু চড়াই-উতরাই দেখেছেন, কিন্তু সেদিনের দৃশ্যটি তাঁর জীবনের সব অভিজ্ঞতাকে ওলটপালট করে দিয়েছিল।

হঠাৎ করেই ট্রাকের হেডলাইটের আলোয় তিনি দেখলেন—রাস্তার ঠিক মাঝখানে বসে আছে ছোট্ট একটি বিড়াল। শরীরটা বৃষ্টিতে ভিজে একাকার। সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে যেকোনো প্রাণী ভয়ে দূরে পালিয়ে যায়, কিন্তু সে নড়ল না। সে দক্ষিণমুখী হয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল সামনের অন্তহীন অন্ধকারের দিকে। দূরে তখনো একটি গাড়ির লাল টেইল লাইট বা পেছনের আলো দেখা যাচ্ছিল, যা বাঁক নিয়ে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছিল। ওটাই ছিল সেই গাড়ি, যা তাকে একটু আগে সেখানে ফেলে রেখে চলে গেছে। চালক ট্রাক থামিয়ে কাছে গেলেন। এমনকি ভেজা রাস্তায় হাঁটু গেড়ে বসার পরও বিড়ালটি পালানোর চেষ্টা করল না। সে কোনো রাগ বা ভয় দেখায়নি; শুধু এক বুক বিভ্রান্তি নিয়ে চালকের দিকে চোখ তুলে তাকাল। যেন সে অবুঝ মনে বোঝার চেষ্টা করছিল—সে কী ভুল করেছিল যে তাকে এভাবে ফেলে যাওয়া হলো?তাকে যখন কোলে তুলে নেওয়া হলো, ঠান্ডার চেয়েও বেশি সে কাঁপছিল এক গভীর আতঙ্কে। পরে চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে জানিয়েছিলেন, এই কাঁপুনি ছিল তীব্র মানসিক ট্রমার লক্ষণ। বিড়ালটির গলায় একটি ফিকে নীল রঙের কলার ছিল, কিন্তু কোনো নামফলক বা মাইক্রোচিপ ছিল না। তবে তার পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, কাটা নখ আর টিকার ইতিহাস বলে দিচ্ছিল—সে কোনো বন্য বিড়াল নয়, বরং একসময় কারও ঘরের খুব আদরের সোনা ছিল।

ট্রাকের কেবিনে বসানোর পরও সে চোখ ফেরায়নি। প্রায় এক ঘণ্টারও বেশি সময় সে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল সেই রাস্তার দিকে, যেদিক দিয়ে তার চেনা মানুষগুলো তাকে ছেড়ে চলে গেছে। উদ্ধার করার ঠিক আগের মুহূর্তে চালক নিজের মুঠোফোনে একটি ছবি তুলেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন পৃথিবী দেখুক—আশ্রয়কেন্দ্রের নিরাপদ জীবনের আগের মুহূর্তটা কেমন হয়, যখন একটি প্রাণীকে নির্মমভাবে পরিত্যাগ করা হয়।

পরদিন ছবিটি ট্রাকারদের একটি অনলাইন ফোরামে পোস্ট করা হলে তা দ্রুত বিশ্বজুড়ে ভাইরাল হয়ে যায়। লাখ লাখ মানুষের হৃদয়ে দাগ কাটে সেই ছবি। এদিকে তীব্র মানসিক আঘাতের কারণে বিড়ালটি টানা পাঁচ দিন ফস্টার হোমে কিছু খায়নি। সে খাঁচার এক কোণে মুখ লুকিয়ে বসে থাকত। কেবল একটি জিনিসেই সে প্রতিক্রিয়া দেখাত—বাইরে কোনো গাড়ির হর্ন বা চাকার শব্দ হলে সে ধড়ফড় করে উঠে দরজার দিকে তাকাত। সে হয়তো ভাবত, সেই চেনা গাড়িটি তাকে নিতে বুঝি ফিরে এসেছে! ছয় দিনের মাথায় সেই ট্রাক চালক আবারও ফোন করলেন এবং জানতে পারলেন কেউ তাকে নিতে আসেনি। তিনি আর দেরি না করে চার ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে ফস্টার হোমে ছুটে এলেন। খাঁচার দরজা খুলতেই বিড়ালটি চালককে চিনতে পারল এবং আলতো করে তাঁর কোলে উঠে বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে দিল। সে মনে রেখেছিল সেই একমাত্র মানুষটাকে, যে তার জন্য মাঝরাতে গাড়ি থামিয়েছিল।

১৪ ফেব্রুয়ারির সেই অভিশপ্ত ও আশীর্বাদের স্মৃতি ধরে রাখতে চালক তার নাম রাখলেন “ফোরটিন” (Fourteen)। তিনি চেয়েছিলেন, ফোরটিন যেন দিনটিকে ফেলে যাওয়ার দিন হিসেবে নয়, বরং নতুন করে বুক ভরে বেঁচে ওঠার দিন হিসেবে মনে রাখে। আজ ফোরটিন জর্জিয়ার এক শান্ত, সুন্দর বাড়িতে থাকে। জানালার পাশে তার আরামদায়ক বিছানা আর খাবারের বাটি সবসময় পূর্ণ থাকে। কিন্তু আজও সে একটা কাজ নিয়ম করে করে। চালক যখনই বাড়ির বাইরে যান—তা কাজ শেষে ফেরা হোক কিংবা স্রেফ ডাকবাক্স থেকে চিঠি আনা—ফোরটিন জানালার পাশে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। সে অপলক চোখে তাকিয়ে থাকে, যতক্ষণ না চালক দরজা খুলে ঘরের ভেতরে ঢোকেন। সে প্রতিবার নিশ্চিত হতে চায়—এই মানুষটা তাকে ফেলে চলে যাচ্ছে না তো? যে মানুষটি তাকে ফেলে গিয়েছিল,

সে হয়তো নিজের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে গেছে, কফি খাচ্ছে, ঘুমাচ্ছে। কিন্তু সেদিনের সেই নীরবতা আর দূরে মিলিয়ে যাওয়া ইঞ্জিনের শব্দ ফোরটিনের মনের ভেতর যে ক্ষত তৈরি করেছিল, তা হয়তো পুরোপুরি কোনোদিন শুকাবে না। কিছু জিনিস সহিংসতায় ভাঙে না, ভাঙে নীরবতায়। তবে গল্পটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—পৃথিবীটা পুরোপুরি নিষ্ঠুর হয়ে যায়নি। রাত ২টার ঘুটঘুটে অন্ধকারেও কোনো এক অচেনা মানুষ নেমে আসে পরম নির্ভরতা হয়ে। অন্য কেউ ফেলে দিলেও, কিছু প্রাণ যে কতটা বিশেষ—তা প্রমাণ করতেই প্রকৃতি এমন মানুষদের পাঠায়। আর এই নিঃস্বার্থ সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত বদলে দেয় দুটি জীবনের গল্প। যে মানুষটি তাকে ফেলে গিয়েছিল, সে হয়তো নিজের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে গেছে, কফি খাচ্ছে, ঘুমাচ্ছে। কিন্তু সেদিনের সেই নীরবতা আর দূরে মিলিয়ে যাওয়া ইঞ্জিনের শব্দ ফোরটিনের মনের ভেতর যে ক্ষত তৈরি করেছিল, তা হয়তো পুরোপুরি কোনোদিন শুকাবে না।

কিছু জিনিস সহিংসতায় ভাঙে না, ভাঙে নীরবতায় ও চরম বিশ্বাসভঙ্গে। তবে ফোরটিনের এই গল্পটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—পৃথিবীটা পুরোপুরি নিষ্ঠুর হয়ে যায়নি। রাত ২টার ঘুটঘুটে অন্ধকারেও কোনো এক অচেনা মানুষ নেমে আসে পরম নির্ভরতা হয়ে। অন্য কেউ ফেলে দিলেও, কিছু প্রাণ যে কতটা বিশেষ—তা প্রমাণ করতেই প্রকৃতি এমন মানুষদের পাঠায়। আর এই নিঃস্বার্থ সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত বদলে দেয় দুটি জীবনের গল্প।

এটি  জাহানার শাওন  (Jahanara Shaon) এর facebook copied পোস্ট থেকে নেয়া এবং ব্যাক গ্রউন্ড ইন্সট্রুমেন্টাল মিউজিক মরহুম আইয়ুব বাচ্চুর সেই তুমি গানের।  

মন্তব্যসমূহ (০)


Lost Password