কালের সাক্ষী ঐতিহাসিক বাহাদুর শাহ পার্ক

কালের সাক্ষী ঐতিহাসিক বাহাদুর শাহ পার্ক

ভারতীয় উপমহাদেশে তথা বাংলাদেশে ব্রিটিশদের ঔপনিবেশিক শাসনামলের স্মৃতিবিজড়িত বাহাদুর শাহ পার্ক ঢাকার ঐতিহ্য ও গৌরব বহন করে আসছে। পুরান ঢাকার সদরঘাটের কাছে লক্ষ্মীবাজারে এই ময়দানের প্রথম নাম ছিল ‘আন্টাঘর’। এরপর এর নামকরণ হয় ভিক্টোরিয়া পার্ক। এখন এটি বাহাদুর শাহ পার্ক নামে পরিচিত।

ঢাকার আর্মেনীয়দের বিলিয়ার্ড ক্লাব ছিল এই ময়দানে। স্থানীয়ভাবে ‘আন্টাঘর’ নামে পরিচিত ছিল এটি। ক্লাবঘরটির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন ঢাকার নবাব আব্দুল গণি ও নবাব আহসান উল্লাহ। এখানে ইংরেজরা বিলিয়ার্ড, টেনিস ও ব্যাডমিন্টন খেলতো আর আড্ডা দিতো। এছাড়া পার্টিও আয়োজন করা হতো।

১৮৫৭ সালে মোগল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহের আমলে এই ময়দান বিশেষ খ্যাতি অর্জন করে। ১৮৫৭ সালের ২২ নভেম্বর ইংরেজ মেরিন সেনারা ঢাকার লালবাগের কেল্লায় দেশীয় সেনাদের নিরস্ত্র করার লক্ষ্যে আক্রমণ চালায়। কিন্তু সিপাহীরা বাধা দিলে যুদ্ধ বেঁধে যায়। যুদ্ধে আহত ও পালিয়ে যাওয়া সিপাহীদের ধরে এনে সংক্ষিপ্ত কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। বিচারের পর ১১ জন সিপাহীকে আন্টাঘর ময়দানে এনে প্রকাশ্যে ফাঁসি দেওয়া হয়। স্থানীয় লোকদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করতে লাশগুলো বহুদিন ধরে এখানকার বিভিন্ন গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়। মানুষ তখন ভয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পায়নি। এরপর বহুদিন পর্যন্ত এই ময়দানের চারপাশ দিয়ে হাঁটতে ঢাকাবাসী ভয় পেতো। কারণ জায়গাটি নিয়ে বিভিন্ন ভৌতিক কাহিনি ছড়িয়ে পড়েছিল।

১৮৫৮ সালে রানি ভিক্টোরিয়া ভারতবর্ষের শাসনভার গ্রহণের পর এই ময়দানের নামকরণ হয় ‘ভিক্টোরিয়া পার্ক’। ১৯৫৭ সালের আগ পর্যন্ত পার্কটি এই নামেই পরিচিত ছিল।১৯৫৭ সালে (মতান্তরে ১৯৬১) সিপাহী বিদ্রোহের শতবার্ষিকী উপলক্ষে এখানে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণের মধ্য দিয়ে ময়দানের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় বাহাদুর শাহ পার্ক। সেই থেকে এই নামে পরিচিত জায়গাটি।

সিপাহী বিদ্রোহ দমনের পর ইংরেজরা তাদের সেনাদের স্মরণে আন্টাঘরে একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করেছিল। এখানে ঢাকার নবাব স্যার খাজা আহসানুল্লাহর জ্যেষ্ঠ পুত্র খাজা হাফিজুল্লাহর স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে। ১৮৮৪ সালে হঠাৎ হাফিজুল্লাহর অকাল মৃত্যুতে নবাব পরিবার তথা পুরো ঢাকা শহর শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে। তার স্মৃতিরক্ষায় ইংরেজরা এখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করে।

বাহাদুর শাহ পার্কে চোখে পড়ে একটি স্মৃতিসৌধ। এটি চারটি পিলারের ওপর দাঁড়ানো চারকোনা একটি কাঠামো। এর ওপরে আছে একটি ডোম। অন্যপাশে একটি ওবেলিস্ক, যা ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ও ভারতবর্ষের সম্রাজ্ঞী হিসেবে রানি ভিক্টোরিয়ার সিংহাসনে আরোহনের কথা মনে করিয়ে দেয়।

বাহাদুর শাহ পার্ক পুরাণ ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে অবস্থিত।বর্তমানে চারদিকে লোহার রেলিং দিয়ে ঘেরা ডিম্বাকৃতির পার্কটির পূর্ব ও পশ্চিমে ফটক আছে। ভেতরে চারদিকে পাকা রাস্তা। সেখানে এখন সকাল-বিকাল বিভিন্ন বয়সী মানুষ হাঁটেন।

পার্কটিকে ঘিরে সাতটি রাস্তা একত্রিত হয়েছে, এটাই এর অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য।

পশ্চিম দিকে শাঁখারি বাজার, উত্তর দিকে রায় সাহেব বাজার ও কলতা বাজার, দক্ষিণ দিকে সদরঘাট ও নর্থ ব্রুক হল রোড, পূর্ব দিকে লক্ষ্মীবাজার।

এই পার্ক ঘিরে রয়েছে বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যার বেশিরভাগ ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, কবি নজরুল কলেজ ও ঢাকা মুসলিম গভর্মেন্ট হাইস্কুল পার্ক লাগোয়া।

মানে পার্কটি ঘিরে রয়েছে এই তিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তবে পার্ক এলাকার কাছাকাছি রয়েছে আরো কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেমন পার্কের পূর্ব দিকে রয়েছে ঐতিহাসিক সেন্ট গ্রেগরি হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ ও সেন্ট ফ্রানসিস জেভিয়ার্স গার্লস হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ, মহানগরী কলেজ, সেন্ট্রাল স্কুল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, পশ্চিম দিকে শাঁখারি বাজারের মুখে রয়েছে প্রোগজ হাইস্কুল বর্তমান নাম প্রোগজ ল্যাবরেটরি হাইস্কুল। দক্ষিণে আছে ঢাকা কলেজিয়েট গভর্নমেন্ট হাইস্কুল ও বাংলাবাজার গার্লস হাইস্কুল।


মন্তব্যসমূহ (০)


Lost Password