 |
| শহীদ ওসমান হাদি |
শরিফ ওসমান গনি, যিনি শরিফ ওসমান হাদি নামেই বেশি পরিচিত, ছিলেন এক নিরহংকারী প্রতিভা, যিনি খুব অল্প সময়েই রাজনীতি, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চেতনার এক অনন্য মিল ঘটাতে সক্ষম হয়েছিলেন।
১৯৯৩ সালে ঝালকাঠি জেলার নলছিটিতে জন্ম নেওয়া এই তরুণ মাদ্রাসায় উচ্চমাধ্যমিক শেষ করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অধ্যয়ন করেন। তিনি শুধু ইনসাফ বা ন্যায়ের পক্ষে এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হিসেবে নয়, বরং, বাংলাদেশের সমাজ বাস্তবতা এবং অভ্যুত্থান পরবর্তী প্রেক্ষাপটের গভীরতায় প্রবেশ করে বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, রাজনীতি এবং সামগ্রিক চিন্তাধারায় একটি নিজস্ব দর্শন দাঁড় করাতে পেরেছিলেন৷ কিন্ত, মাত্র ৩২ বছর বয়সেই মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর কাছে তাকে নিয়ে গেলেন, অবশ্য এরকম শহীদি মৃত্যুর চিরায়ত কামনাই যেন ছিল তার!
ওসমান হাদি সবসময়ই মানুষের কথা বলতেন। তার হৃদয় ছিল দরদে ভরা; শব্দগুলো তাঁর কবিতায় কেবল কাগজে লেখা শব্দ ছিল না, তারা ছিল বঞ্চিত ও নিপীড়িতদের দীর্ঘশ্বাস। যেখানে, ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-রাজনৈতিক পরিচয়ের কোনো বিভেদ ছিল না। তিনি “সীমান্ত শরিফ” নামে কবিতা লিখতেন এবং এ নামেই একটি শক্তিশালী প্রতিবাদী সত্তা হিসেবে সাহিত্য জগতে আবির্ভূত হয়েছিলেন (জাগো নিউজ ২৪, ২০২৫)৷
সীমান্ত শরিফ নামে তিনি সমাজের নানা অসমতা, অবিচার, রাজনৈতিক দমননীতি ও মানুষের অন্তরের কণ্ঠকে কবিতায় রূপ দিতেন। তাঁর কবিতা শুধু রাজনৈতিক তলোয়ারের মতো নয়, বরং মানুষের হৃদয়ের সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করার একটি ভাষা ছিল। যেমন, জীবনের বাস্তবতা, বেদনাশোক ও আশা-আকাঙ্ক্ষা একাকার হয়ে উঠত তার লেখায়৷
তবে, দুঃখজনক হলেও সত্যি, তিনি শহীদ হওয়ার পর তাঁর শাহাদাতকে কেন্দ্র করে কেউ কেউ জ্বালাও-পোড়াও করছেন, ভাংচুর করছেন। এতে কি শহীদের আত্মা কষ্ট পাবে না? দয়া করে সকলেই একটু ভাবুন! ওসমান হাদি সেই ব্যক্তিত্ব, যিনি মানুষকে ভালোবাসার কথা বলেছেন, খুব অল্প সময়ের নির্বাচনী প্রচারণাতে সকল শ্রেণির সাধারণ মানুষকে বুকে জড়িয়ে নিয়েছেন, তাঁর দিকে ময়লা পানি ছুঁড়ে মারলেও ক্ষুব্ধ-ক্ষান্ত হননি। 'মব জাস্টিস', ভাংচুর কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার বিপক্ষে ছিলেন তিনি। পতিত আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দলের ভালো-মন্দ নিয়েই কথা বলেছেন তিনি। অনেক সময় অনেক কথার কারণে সমালোচিত হয়েছেন। রক্ত-মাংসের মানুষ তো, ভুল-ত্রুটি আমাদের সবারই তো আছে, থাকবে। আমরা কেউ তো মহাপুরুষ নই। কিন্তু, দেশপ্রেম, সত্য আর ন্যয়পরায়ণতার যে উদাহরণ তিনি তৈরি করেছেন এই তরুণ বয়সে, তা দীর্ঘ জীবনেও অনেকে পারেন না।

ওসমান হাদি বিশ্বাস করতেন যে মঞ্চে দাঁড়িয়ে কেবল বক্তৃতা দিলেই রাজনীতি শেষ হয়ে যায় না; বরং, সাহিত্য ও সংস্কৃতিই মানুষকে জাগ্রত করে এবং শব্দের শক্তি মানুষের মনকে পরিবর্তন করতে পারে। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি গান-বাজনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ধর্মীয় আলোচনা সংগঠিত করেছেন, যেখানে মানুষের জীবনের নান্দনিকতার পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধের কথা উচ্চারিত হতো। এসব আয়োজনের মাধ্যমে তিনি এমন একটি সাংস্কৃতিক ধারা সৃষ্টি করেছিলেন যেখানে সংগীত এবং কবিতা জীবনের সত্যকে ফুটিয়ে তোলা এক শক্তিশালী মাধ্যম ছিল৷
এসব আয়োজনের ব্যানার ছিল 'ইনকিলাব মঞ্চ'। আয়োজনগুলোতে তিনি শুধু বক্তা ছিলেন না, ছিলেন সংগীতশিল্পী, কবি, অনুষ্ঠানের আচার্য এবং সাংগঠনিক নেতৃত্বও। তিনি শুনতেন মানুষের গল্প, অনুভব করতেন তাদের বেদনা, তারপর সেই অনুভূতিটাই শব্দে রূপ পেত, গান-সংগীতে বেজে উঠত, আর সমাজে তা শক্তির সঞ্চার করত। মানুষের চোখে তিনি শুধু রাজনীতিক নয়, একজন মানবিক চেতনার কণ্ঠস্বরও ছিলেন, যিনি মানুষের জীবনের কাছ থেকে শব্দ নিয়ে শব্দকে মানুষের কাছে ফেরত দিতেন৷
তিনি রাজনৈতিক কর্মসূচি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি নিজেও হামদ-নাত, গান গেয়েছেন, ধর্মীয় ও নৈতিক আলোচনায় তরুণদের সাথে যুক্ত হয়েছেন এবং এক অদ্ভুত সাহসিকতায় লোকসাহিত্য, রাজনৈতিক গান ও কবিতার ভাষা দিয়ে মানুষের মন গড়ার চেষ্টা করেছেন ভালোবাসা, ন্যায় ও মানবিকতার ভাষায়৷
ওসমান হাদি চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর শব্দ এখনো বাংলার মানুষের মনোজগতে প্রবাহমান। তাঁর কবিতা, সংগীত, স্বপ্ন ও সংগ্রাম এসবকিছুই তরুণদের মধ্যে সাহস, স্বপ্ন, ভাষা এবং আলো জোগাবে আরও অনেকদিন।
শহীদ ওসমান হাদির দুটি কবিতা
আগুন কি আলো নয়
ওয়েস্টফেলিয়ায় এলো আধুনিকতা
ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশনে মানবাধিকার
পশ্চিমা সূর্যে এলো রেনেসাঁর রূপসি রোদ
কলোনিতে আলোকায়ন এলো কিরণের নামে
তারপর তো শুধু সাম্য, মৈত্রী আর স্বাধীনতা!
প্রিন্স অব ওয়েলসে ঘোষণা হলো-
গণহত্যা গিলে খাবে না দুনিয়ারে আর
অতঃপর হলোকাস্টের হাঁপর নিভায়ে
শান্তির সুনামি আনল আটলান্টিক সভ্যতা!
এরপর? সত্তর বছর ধরে
তাফালের তুষ হলো প্রাচ্য
লাভায় লালশাক হয়ে গেল পুবের আকাশ
জেরুসালেম হয়ে গেল জল্লাদের জলসাঘর!
সভ্যতার এ শ্বেত শতাব্দীতে
গাজায় বারুদ নাচে উদ্দাম বিমানে
সহস্র সংসার হয়ে যায় প্রকাশ্য হিরোশিমা
চাম্বল পাতার মতো উড়ে যায় শিশুদের প্রাণ
মায়েরা খুলি কুড়িয়ে জোড়া দেয় ছিন্নভিন্ন মাথা
রক্তের ফিনকিতে ছিঁড়ে যায় আজরাইলের খাতা।
আমায় ছিঁড়ে খাও হে শকুন
আমায় ছিঁড়ে খাও হে শকুন
হে সীমান্তের শকুন
এক্ষুনি ছিঁড়ে খাও আমাকে
হে আটলান্টিকের ঈগল
শিগগির খুবলে খাও আমাকে
হে বৈকাল হ্রদের বাজ
আঁচড়ে কামড়ে ছিন্নভিন্ন করো আমাকে।
আমার রক্তরসে শুধু অসহায়ত্ব আর অভাব;
কাগজের কামলারা তারে আদর করে মুদ্রাস্ফীতি ডাকে।
ঋণের চাপে নীল হয়ে যাচ্ছে আমার অণুচক্রিকা
সংসার চালাতে অন্তরে হয় ইন্টারনাল ব্লিডিং
কী আশ্চর্য, তবুও আমি মরছি না!
ওদিকে দোজখের ভয়ে
আত্মহত্যা করবারও সাহস পাই না আমি!
খোদাকে বললাম, আমি মরতে চাই
তিনি বললেন, বেঁচে আছ কে বলল?
সহস্রাব্দ উন্নয়নের সাক্ষী হিসেবে
রাজা তোমাকে মমি করে রেখেছেন!
বাজারে দীর্ঘশ্বাস ফেললে নাকি
রাজ্যের ভীষণ বদনাম হয়
রাজারও মন খারাপ হয় খুব।
কোতোয়ালরা ফরমান জারি করেছে
আমাকে সারাক্ষণই হাসতে হবে!
নইলে দেশি কুকুর ও বিদেশি মাগুরকে
একবেলা ভালোমন্দ খাওয়ানো হবে আমার মাংস দিয়ে
নিত্যদিন ব্রয়লারের ভুঁড়ি নাকি ওদের ভাল্লাগে না!
অথবা আমাকে ভাগ দিয়ে বেচা হবে
মানুষেরও তো মানুষ খাওয়ার সাধ হতে পারে, তাই না?
ভাগ্যিস তা বিদেশি সুপারশপে বিকি হবে না
দেশি মানুষেরই তো হক বেশি আমাকে খাওয়ার!
এ দোজখই যখন নিয়তি
তখন আমি উদাম হয়ে ডাকছি
দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ মাংসাশী বিহগদের
হে ঈগল, চিল ও ভয়ংকর বাজেরা
হে সাম্রাজ্যবাদী সাহসী শকুনিরা
তোমরা এফ-থার্টি ফাইভের মতো
মিগ টুয়েন্টি নাইনের মতো—
দল বেঁধে হামলে পড়ো আমার বুকে
আমার রান, থান, চক্ষু, কলিজা
আজ সব তোমাদের গনিমতের মাল
দেশি শুয়োর খুবলে খাওয়ার আগেই
আমায় ইচ্ছেমতো ছিঁড়ে খাও তোমরা!
দোহাই, শুধু মস্তিষ্কটা খেয়ো না আমার
তা হলে শীঘ্রই দাস হয়ে যাবে তোমরাও।
লেখক,
মো. রিদওয়ান আল হাসান,
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, সাহিত্যনামা
তথ্যসূত্র
জাগো নিউজ ২৪ (২০২৫)। ওসমান হাদি কবিতা লিখতেন ‘সীমান্ত শরিফ’ নামে। জাগো নিউজ ২৪, ২০ ডিসেম্বর ২০২৫
https://www.jagonews24.com/literature/article/1077154 (Jagonews24)
বর্তা টাইমস (২০২৫)। এক শহীদের জীবনের গল্প: শরিফ ওসমান হাদি
https://bartatimes.com/news/34687 (bartatimes.com)
ওসমান হাদির কবিতা
https://www.alokitobangladesh.com/print-edition/khobor/310886
মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন