আখতার জাহান সাথী
উপজেলা নির্বাহী অফিসার, মান্দা, নওগাঁ
বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হচ্ছে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক লভ্যাংশ। একটি দেশের মোট জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ বা তারও বেশির বয়স যখন ১৫ বছর থেকে ৬৪ বছরের মধ্যে অর্থাৎ কর্মক্ষম থাকে, সেই অবস্থাকে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বলা হয়। হাজার বছরে একবার একটি জাতির জীবনে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগ আসে। সুযোগের সময়সীমা: ২০১৮ সালে জনপ্রিয় হওয়া এই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড এর সুবিধা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বহাল থাকবে ২০৪০ সাল পর্যন্ত। বৈশ্বিক উদাহরণ: যে সকল দেশ এই অবস্থার সুফল পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে পেরেছে, সেই দেশ বিশ্ব অর্থনীতিতে সুবিধাজনক স্থানে পৌঁছাতে পেরেছে। যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের কয়েক দশক পর ভঙ্গুর জাপান ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগ কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক মিরাকেল হিসেবে বিশ্বে নিজেদের আত্মপ্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশের বর্তমান জনমিতিক চিত্র (২০২৬ সালের প্রেক্ষাপট): বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ এর চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯৮ লাখ ২৮ হাজার ৯১১ জন। এর মধ্যে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ১১ কোটি ৭ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার ৬৫.২৩%। ইউএনডিপির মতে, আগামী ২০৩০ সালে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেড়ে হবে ১২ কোটি ৯৮ লাখে এবং ২০৫০ সাল নাগাদ হবে ১৩ কোটি ৬০ লাখ। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: আজকে ২০২৬ সালে যে শিশুটি প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করলো, ২০৪০ সালে তার বয়স হবে ১৯ কিংবা ২০। সুতরাং, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুফল পেতে এই শিশুটিকে কেন্দ্র করে যুগোপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
পরিকল্পনার প্রাথমিক পর্যায় হলো বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা। বাংলাদেশের ২১ টি জেলার ১৮০৩ জন স্কুল শিক্ষার্থীদের উপর পরিচালিত গবেষণায় এক উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে: ৬৭.১১% শিক্ষার্থী প্রতিদিন মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। ৩৯% শিক্ষার্থী কার্টুন বা ভিডিও দেখার জন্য মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। ১৭% শিক্ষার্থী মোবাইলে গেম খেলে। ২৬.৪৬% শিক্ষার্থী নিয়মিত বাইরে খেলাধূলা করে না। বাংলাদেশি শিশুরা প্রতিদিন গড়ে ৪.৬ ঘণ্টা স্ক্রিনে সময় কাটায়। অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারের ক্ষতিকর প্রভাব (দৈনিক ২ ঘণ্টার বেশি): ঘুমের সমস্যা: ৫১.১১% মাথা ব্যাথা: ৪৫.২৬% দৃষ্টিশক্তির সমস্যা: ৪৫.৫১% বিষন্নতা: ৫২.১২% এখানে স্পষ্টত যে, বাংলাদেশের জনসংখ্যার যে বৃহঅনীহা, সাইবার অপরাধ, নেতৃত্ব ও যোগাযোগ দক্ষতা হ্রাস এবং উদ্যোক্তা মানসিকতা হ্রাসের মত সমস্যা আমাদের সামনে আসছে—যা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুফল প্রাপ্তির পথে বড় বাঁধা। ৩. প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভূমিকা: বয়স ভিত্তিক শিক্ষণ কৌশল ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লব উভয়কে এক সুতায় বাঁধার জন্য প্রয়োজন সৃজনশীল, উদ্ভাবনী এবং বাস্তবনির্ভর শিক্ষণ কৌশল, যার ভিত তৈরি হবে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে। একটি শিশুর ০৩ হতে ১২ বছর বয়স পর্যন্ত মস্তিষ্ক বিকশিত হওয়ার প্রাকৃতিক ছন্দ অনুযায়ী বিদ্যালয়গুলোকে আনন্দমুখর করে তুলতে হবে: বয়স সীমা | বিকাশের ক্ষেত্র ও আচরণ |
বিদ্যালয়ের করণীয় ও ভূমিকা
০৩ থেকে ০৫ বছর | চরিত্র ও ব্যক্তিত্ব বিষয়ে আগ্রহী হয়। | নীতিশিক্ষার গল্প, ছবিভিত্তিক আলোচনা ও দলগত কার্যক্রমের মাধ্যমে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ তৈরির আঁতুড়ঘর হওয়া।
০৬ থেকে ০৮ বছর | যুক্তিসঙ্গত চিন্তা করতে ও সামাজিকীকরণ শিখে। | খেলাধূলা, গ্রুপস্টাডি ও শিক্ষা সহায়ক প্রতিযোগিতার সুযোগ তৈরির মাধ্যমে সৃজনশীলতা বিকাশের কেন্দ্রস্থল হওয়া। ০৯ থেকে ১২ বছর | আত্মনির্ভরশীলতা ও পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ার মনোভাব তৈরি হয়। | প্রজেক্ট তৈরি ও মেধাভিত্তিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে উদ্ভাবনী বিকাশের প্রারম্ভিক অনুপ্রেরণা হওয়া।
বিদ্যালয়গুলোতে সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক এবং সহমর্মিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে যেতে আগ্রহী হবে এবং স্ক্রিনে অযথা সময় দেওয়া থেকে বিরত থাকবে। ৪. সচেতন অভিভাবকের দায়িত্ব শিক্ষার্থীদের মেধা ও মননশীলতা বিকাশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশাপাশি অভিভাবকদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। শিশুরা স্বভাবগত কারণেই অনুকরণপ্রিয় এবং পিতা-মাতার মনোযোগ প্রত্যাশী। icdd-এর গবেষণা: অভিভাবকদের দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহার শিশুদের স্ক্রিন নির্ভরতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। অপকারিতা: এর ফলে অভিভাবকদের সাথে শিক্ষার্থীদের আবেগীয় সংযোগ হ্রাস, ভাষা ও যোগাযোগ দক্ষতা বিলম্ব, মূল্যবোধের অবক্ষয়, আচরণগত ত্রুটি এবং সামাজিক দক্ষতার ঘাটতি সৃষ্টি হচ্ছে। অভিভাবকের করণীয়: ১. সন্তানের সাথে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন করা এবং সন্তানের ভাবনার বিষয়ে সক্রিয় আগ্রহ দেখিয়ে মানসিক বিকাশে সহযোগিতা করা। ২. শিক্ষকের সাথে নিয়মিত সমন্বয় করে সন্তানের দুর্বলতা বা ঘাটতি এবং তার উদ্ভাবনী চিন্তা বা সম্ভাবনার বিষয় সম্পর্কে অবহিত হওয়া। ৫. বৈশ্বিক মডেল: চীনের শিক্ষা সংস্কার নীতি চীন ১৯৮০ থেকে ২০১০ পর্যন্ত ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুবিধা কাজে লাগিয়ে বিশ্বের অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে রুপান্তরিত হয়েছে। ২০২১ সালে চীন "শুয়াংজিয়ান" (Shuangjian) বা "ডাবল রিডাকশন নীতি" নামে একটি শিক্ষা সংস্কার নীতি চালু করেছে, যার উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীদের স্কুলের বাইরে আলাদা করে হোমওয়ার্ক এবং কোচিংয়ের চাপ কমিয়ে আনন্দময় ও ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা নিশ্চিত করা।
চীনের গৃহীত পদক্ষেপসমূহ: আফটার স্কুল কার্যক্রম: স্কুলগুলোতে বিভিন্ন ক্লাব, শিল্পকলা, খেলাধূলা এবং সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের আয়োজন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। গেম ভিত্তিক লিখন: মুখস্থ নির্ভর পড়াশোনার পরিবর্তে শ্রেণীকক্ষে পাজল, কুইজ ও আকর্ষণীয় কর্মকাণ্ডের দ্বারা পাঠদান জনপ্রিয় করা হয়েছে। শারীরিক শিক্ষা: প্রতিদিনের পাঠ্যসূচিতে শারীরিক শিক্ষার সময় বাড়ানো হয়েছে। প্রযুক্তির ব্যবহার: প্রায় প্রতিটি বিদ্যালয়ে স্মার্টবোর্ড, প্রজেক্টর ও বিভিন্ন শিক্ষামূলক অ্যাপ ব্যবহার করা হচ্ছে। উপসংহার ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুবর্ণ সুযোগ কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। জনসম্পদকে জনশক্তিতে রূপান্তর করতে না পারলে এর পরিণাম আমাদেরকেই বহন করতে হবে।
তাই ভবিষ্যতের জন্য দক্ষ জনশক্তি নির্মাণে স্ক্রিনে আসক্ত সন্তানদের আনন্দমুখর পরিবেশে সৃজনশীল ও মেধা বিকাশ সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে জড়িত করার ক্ষেত্রে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে উদ্ভাবনী নির্ভর, বাস্তবমুখী এবং অনুপ্রেরণামূলক শিক্ষণ কৌশলে মনযোগী হতে হবে। তার পাশাপাশি সামাজিকীকরণ ও মূল্যবোধ চর্চায় সন্তানদের প্রতি অভিভাবকদের দায়িত্বশীল হতে হবে। তবেই আত্মপ্রত্যয়ী ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আত্মোন্নয়নের পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্য ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুফল বয়ে নিয়ে আসবে। আমরা উজ্জ্বল ও সম্ভবনাময়ী ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বপ্ন দেখি।
মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন