ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত সাক্ষী হোসনি দালান ও তাজিয়া মিছিল

ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত সাক্ষী হোসনি দালান ও তাজিয়া মিছিল

হোসনি দালান বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার পুরান ঢাকায় অবস্থিত একটি অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহাসিক স্থাপনা। এটি মূলত শিয়া মুসলমানদের পবিত্র স্থান এবং মহররম মাসে আশুরা উদযাপনের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। মোগল শাসনামলে নির্মিত এই ইমারতটি ঢাকার ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

হিজরি ৬১ সনের ১০ মহররম মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) এর প্রিয় দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসেন (রা.) কারবালার প্রান্তরে ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে শাহাদাত বরণ করেন। এই শোক ও স্মৃতিকে স্মরণ করে সারাবিশ্বে মুসলমানরা আশুরা পালন করেন। আর এরই স্মরণে ১৭ শতকে সম্রাট শাহজাহানের আমলে নির্মাণ করা হয় হোসেনি দালান।

প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, ১৬৪২ খ্রিস্টাব্দে (১০৫২ হিজরি) শাহ সুজার নৌবাহিনীর সেনাপতি মীর মুরাদ এটি নির্মাণ করেন। কথিত আছে, মীর মুরাদ স্বপ্নে ইমাম হোসাইনকে (রা.) শহীদ অবস্থায় দেখার পর এই দালান নির্মাণের প্রেরণা পান। সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন নবাব ও শাসকের দ্বারা এটি সংস্কার ও সম্প্রসারিত হয়েছে। ১৮৯৭ সালের প্রবল ভূমিকম্পে দালানটির একাংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ এর ব্যাপক সংস্কার কাজ সম্পন্ন করেন, যার ফলে এর মূল মোগল নকশার সাথে ব্রিটিশ স্থাপত্যশৈলীর মিশ্রণ ঘটে।

স্থাপত্যশৈলী:-স্থাপত্যের দিক দিয়ে হোসনি দালান আসলেই চোখ ধাঁধানো। মুঘল ও দেশি কারিগরের মিশেল।

হোসনি দালানের স্থাপত্যে মোগল ও ইউরোপীয় স্থাপত্যরীতির এক অপূর্ব সমন্বয় লক্ষ্য করা যায়। এই স্থাপনার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

প্রবেশপথের খিলান:- মূল দরজায় বড় বড় খিলান। খিলানের চারপাশে পোড়ামাটির কারুকাজ আর কুরআনের আয়াত খোদাই করা। ১৭ শতকের কাজ, এখনও ঝাপসা হয়নি।

ভেতরের স্তম্ভ: -ভেতরে ঢুকলেই সারি সারি চৌকো স্তম্ভ। স্তম্ভের গায়ে আয়নার কাজ আর রঙিন চীনামাটির টুকরা বসানো। মোমবাতির আলো পড়লে পুরো হলটা ঝিকমিক করে।

মিম্বর: -কাঠের মিম্বরটা নিজেই একটা শিল্প। হাতের কাজ করা লতাপাতার নকশা। এখান থেকেই খতিব সাহেব বয়ান করেন।

মূল ভবন:-এটি একটি উঁচু মঞ্চের ওপর নির্মিত। ভবনের অভ্যন্তরে প্রশস্ত কক্ষ রয়েছে যা 'শিরনি কামরা' (যেখানে মানতের খাবার রাখা হয়) এবং 'জারিহ কামরা' (যেখানে কারবালার স্মৃতিবিজড়িত প্রতীক রাখা হয়) নামে পরিচিত।

মিনার ও ছাদ:-নবাব সলিমুল্লাহর সংস্কারের পর এতে সমতল ছাদের পরিবর্তে বর্তমান রূপ দেওয়া হয়। ভবনের চার কোণে চারটি সুদৃশ্য মিনার রয়েছে।

নকশা ও কারুকাজ:-ভবনের প্রবেশদ্বারে খিলান ও পিলারের চমৎকার কারুকাজ রয়েছে। দেওয়ালে আরবি ও ফারসি ভাষায় বিভিন্ন ক্যালিগ্রাফি ও শিলালিপি খোদাই করা আছে।

হাসান ও হোসাইনের মাজার - দালানের ভিতরে হযরত ইমাম হাসান ও ইমাম হোসাইন রা. এর স্মরণে মাজার আছে। শিয়া সম্প্রদায়ের কাছে এগুলো খুব পবিত্র। অনেকেই এখানে মানত করে।


নায়েব নাজিমদের কবর:- দালানের প্ল্যাটফর্মের নিচের রুমগুলোতে ঢাকার শেষ ৪ জন নায়েব নাজিমের কবর আছে। এরা হলেন: নুসরাত জং, শামসুদ্দৌলা, কামরুদ্দৌলা, এবং গাজীউদ্দিন হায়দার।

   আগে এখানে 'মুকবারা-ই-নায়েব নাজিম' নামে ছোট একটা মাজার ভবন ছিলো, যেটা এখন নেই। কিন্তু কবরগুলো এখনো সিঁড়ির পাশে আছে। কবরে নাম লেখা নেই, তাই কোনটা কার কবর সেটা আলাদা করা কঠিন। 

সামনে গোরস্থান:- দালানের সামনে শিয়া সম্প্রদায়ের গোরস্থান আছে। প্রতি বৃহস্পতিবার মানুষ মৃতদের জন্য দোয়া করতে আসে।

পুকুর:-দালানের ঠিক দক্ষিণ দিকে একটি বিশাল ও মনোরম পুকুর রয়েছে, যা এই স্থাপনার সৌন্দর্যকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

খুতবা হল (উত্তরমুখী): -এই হলে চমৎকার নকশাকৃত সাতটি কাঠের ধাপ বিশিষ্ট একটি মিম্বর (বক্তৃতা মঞ্চ) রয়েছে. এই হলের দেয়ালে বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতীক ও আলামত ঝুলানো থাকে।

নারীদের গ্যালারি:- মূল হলরুমগুলোর দুই পাশে দুই তলা বিশিষ্ট ছোট ছোট রুম এবং দোতলায় বারান্দা সদৃশ গ্যালারি রয়েছে, যা শোকসভায় আসা নারীদের বসার জন্য তৈরি করা হয়েছিল।

কাঁচ ও ঝাড়বাতি:- হলের ভেতরের খিলানযুক্ত দরজা এবং সিলিংয়ে সুদৃশ্য ঝাড়বাতি ও কাঁচের চমৎকার কারুকাজ রয়েছে।

চেরাগবাতি স্থাপনের খোপ: -মূল ফটক দিয়ে প্রবেশের পর ভেতরের দেয়ালে ছোট ছোট অসংখ্য খোপ বা কুলুঙ্গি দেখা যায়, যেখানে মহররমের সময় চেরাগ বা প্রদীপ জ্বালানো হয়।

ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব:-

হোসনি দালান ঢাকার শিয়া সম্প্রদায়ের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থান। প্রতি বছর মহররম মাসে কারবালার মর্মান্তিক ঘটনাকে স্মরণ করে এখানে ব্যাপক শোক পালন ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। আশুরার দিন (১০ মহররম) এখান থেকেই ঢাকার ঐতিহ্যবাহী 'তাজিয়া মিছিল' বের হয়, যেখানে হাজার হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করেন। কেবল শিয়া নয়, সুন্নি মুসলমানসহ অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষও এই ঐতিহাসিক আয়োজনে শ্রদ্ধাভরে অংশ নেন, যা ঢাকার দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ঐক্যের এক অনন্য উদাহরণ।

তাজিয়া মিছিল হলো মুসলিম শিয়া সম্প্রদায়ের একটি ঐতিহ্যবাহী ও প্রধান শোক সমাবেশ, যা প্রতি বছর হিজরি সনের প্রথম মাস মহররমের ১০ তারিখে (পবিত্র আশুরার দিন) উদযাপিত হয়. 'তাজিয়া' একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ শোক প্রকাশ করা, সমবেদনা জ্ঞাপন করা বা সান্ত্বনা দেওয়া.। মূলত ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে (৬১ হিজরি) কারবালার প্রান্তরে ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসেন (রা.) ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নির্মম শাহাদাতের স্মরণে এই শোক মিছিল বের করা হয়।

মিছিলের মূল অনুষঙ্গ ও প্রতীকতাজিয়া (প্রতিকৃতি):- বাঁশ, কাঠ, রুপা বা রঙিন কাগজ দিয়ে ইমাম হোসেন (রা.)-এর কারবালাস্থিত সমাধির একটি প্রতীকী বা নকল কবর (মাকবারা) তৈরি করা হয়, যা মিছিলের মূল আকর্ষণ।.আলম ও নিশান: ইসলামের নবী পরিবারের পাঁচজন সদস্যকে (পাঞ্জাতন) নির্দেশকারী পাঁচ আঙুলের একটি খোলা হাতের আকৃতি সম্বলিত দণ্ডকে 'আলম' বলা হয়. এর সাথে কালো ও লাল রঙের শোকের পতাকা (নিশান) বহন করা হয়.।

দুলদুল:- ইমাম হোসেন (রা.)-এর বিশ্বস্ত ও প্রিয় ঘোড়া 'দুলদুল'-এর একটি প্রতীকী সুসজ্জিত ঘোড়া মিছিলে টেনে আনা হয়, যা দেখে অনুসারীরা কান্না ও শোক প্রকাশ করেন।.শোকগাথা ও মাতম: মিছিলের অংশগ্রহণকারীরা সাধারণত কালো পোশাক পরিধান করেন এবং বুকে হাত চাপড়ে "ইয়া হোসেন, ইয়া হোসেন" ধ্বনিতে মাতম ও মার্সিয়া (শোকগান) গাইতে গাইতে অগ্রসর হন।

.বাংলাদেশে তাজিয়া মিছিলের ইতিহাসসূচনা:- বাংলাদেশে মুঘল আমলে, বিশেষ করে ১৬৩৯-১৬৫৯ খ্রিস্টাব্দে সুলতান শাহ সুজার সুবেদার থাকাকালে শিয়া প্রভাব বৃদ্ধির মাধ্যমে ঢাকায় প্রথম তাজিয়া মিছিলের আনুষ্ঠানিক প্রচলন হয়।.উপমহাদেশে বিস্তার: ঐতিহাসিক তথ্যমতে, চতুর্দশ শতকের শেষে (১৩৯৩ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ) দিল্লির সুলতান আমির তৈমুর লং-এর সময় ভারতে প্রথম প্রতীকী কবর বানিয়ে মিছিলের রীতির সূত্রপাত ঘটেছিল।

বর্তমানে হোসনি দালান একটি ওয়াকফ এস্টেট কর্তৃক পরিচালিত হয় এবং এটি বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর দ্বারা একটি সংরক্ষিত ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত। পুরান ঢাকার বকশিবাজার এলাকায় অবস্থিত এই স্থাপনাটি দেখতে প্রতিদিন অসংখ্য দর্শনার্থী, গবেষক ও পর্যটক ভিড় জমান। এটি শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, বরং ঢাকা শহরের ৪০০ বছরের পুরোনো ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত সাক্ষী।


মন্তব্যসমূহ (০)


Lost Password