শ্রমিকদের কাহিনী নিয়ে চলচ্চিত্র

শ্রমজীবী মানুষের জয়গান গাওয়ার একটি পরীক্ষিত দিন। সারা বিশ্বে পালিত হয় শ্রমিক দিবস। ১৮৮৬ সালে আমেরিকার শিকাগোতে মে মাসের প্রথম দিনটিতে যে ইতিহাসের সূচনা হয়েছিলো সেই ইতিহাস আজ পৃথিবীজুড়ে শ্রমিকের কাছে অনুপ্রেরণার। সংস্কৃতি অঙ্গনেও এই দিনের রয়েছে প্রবল ছায়াপাত। বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন ভাষায় শ্রমিকশ্রেণিকে নিয়ে তৈরি হয়েছে চলচ্চিত্র। যেখানে শ্রমিকের কথা বলা হয়েছে, শ্রমিকের অধিকার আদায়ের কথা বলা হয়েছে। সেই ছায়াছবিগুলো নিজ বৈশিষ্ট্যেই বাহ্বা পেয়েছে মানুষের। তেমন কিছু চলচ্চিত্র নিয়ে মহান মে দিবসের এই আয়োজন।

অন দ্য ওয়াটারফ্রন্ট,

শ্রমিকদের নিয়ে তৈরি এই সিনেমাটা বার বার দেখা যায়। ১৯৫৪ সালে মুক্তি পাওয়া এ ছবি অস্কারে ১২টি ক্যাটাগরিতে মনোনয়ন পায়। সেরা ছবি, সেরা পরিচালক, সেরা অভিনেতা, পার্শ্বচরিত্রে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কারসহ আটটি পুরস্কার জোটে “অন দ্য ওয়াটারফ্রন্ট”-এর ভাগ্যে। রি ম্যালয় একজন যোদ্ধা হতে চায়। জিতে নিতে চায় পুরস্কার। জনি ফ্রেন্ডলি নামে এক ট্রেড ইউনিয়নিস্টের জন্য কাজ করে সে। মোটামুটি ভালোই চলছিল দিন। কিন্তু একদিন হঠাৎ টেরির মাথায় বাজ পড়ে।

সে নিজ চোখে দেখে ফেলে, জনির দুই ষণ্ডা মাস্তান খুন করছে একজনকে। যাকে খুন করা হলো, তার বোনের সঙ্গে দেখা হয় টেরির। বুঝতে পারে, এ হত্যার দায় শোধ করতে হবে। কীভাবে আদালতে বিষয়টি নিয়ে লড়তে হবে, সেই পরামর্শ দেয় ফাদার ব্যারি। কীভাবে ইউনিয়ন বাজি করা মাস্তানদের রুখে দিতে হয়, সেটাও উঠে আসে ছবিতে। এই ছবি বারবার দেখা যায়। ইলিয়া কাজান পরিচালিত ছবিটির মূল আকর্ষণ মার্লোন ব্রান্ডোর অসাধারণ অভিনয়। আরও অভিনয় করেছেন কার্ল ম্যালডেন, লি জে কব।

নরমা রে,

পরিবারের অন্য সদস্যদের মতোই নরমা রেও কাজ করে এই অঞ্চলের পোশাক কারখানায়। এখানে কাজ করাই যেন তাদের ভাগ্যলিখন। সারা দিন ঘাম ঝরানোর পর যে মজুরি পায়, তা নিতান্তই কম। আর কাজের পরিবেশও জঘন্য। একদিন শ্রমিকনেতা রুবেনের বক্তৃতায় মোহিত হয়ে পড়ে নরমা রে। সে যোগ দেয় শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলনে। এতে নাখোশ হয় তার পরিবার। বেশি অখুশি হয় তার প্রেমিক। পদে পদে আসতে থাকে বাধা। কিন্তু নিজের দাবিতে নরমা রে থাকে অটল।

পোশাককর্মী থেকে ইউনিয়নের নেতা হয়ে যাওয়া ক্রিস্টাল লি সুটনের জীবনের সত্য ঘটনা অবলম্বনেই ‘নরমা মে’ সিনেমাটি তৈরি হয়েছে। পরিচালক মার্টিন রিট। ছবিতে নরমা চরিত্রে অভিনয় করেছেন স্যালি ফিল্ড। এই ছবিতে অভিনয়ের জন্য তিনি অস্কার লাভ করেন। ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৭৯ সালে।

দ্য পাজামা গেইম,

অধিকার আদায়ের জন্য লড়ে যাওয়া এক পোশাক শিল্পকর্মীর সঙ্গে ওই প্রতিষ্ঠানেরই সুপারভাইজারের প্রেম এবং শেষে বেতন বাড়ানোর লড়াইয়ে জেতা- এরকম এক গল্প নিয়েই ব্রডওয়ের জনপ্রিয় মঞ্চ নাটক থেকে দারুণ সফল এই মিউজিকাল কমেডি সিনেমাটি তৈরি করেন স্ট্যানলি ডোনেন এবং জর্জ অ্যাবোট। সিনেমার প্রধান চরিত্রে বেইব উইলিয়ামসের চরিত্রে ডরিস ডের স্বতস্ফূর্ত অভিনয় মন জয় করে নিয়েছিল সবার। এছাড়া সিনেমার “রেসিং দ্য ক্লক”, “স্টিম হিট” এবং “সেভেন অ্যান্ড আ হাফ সেন্ট” শ্রমিক সংগঠনের কর্মীদের মুখে মুখে ফিরেছে অনেকদিন ধরে।

কয়লা,

ভারতেও শ্রমিকদের কাহিনী নিয়ে অনেক সিনেমা নির্মান হয়েছে। এর মধ্যে শাহরুখ খান ও মাধুরী দিক্ষীত জুটির অনবদ্য একটি সিনেমা “কয়লা”। এই ছবিতে জুটি বেধে অভিনয় করার পর ষরুখ ও মাধুরীর জুটি সর্বমহলে পেয়েছিল দারুণ জনপ্রিয়তা। এই সিনেমায় শাহরুখ খান একজন দাসের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। এই ছবিটিকে বলিউডে শ্রমিকদের উজ্জীবীত করার সিনেমা হিসেবে অভিহিত করা হয়। যেখানে দেখা যায় মালিকপক্ষের নানা অন্যায়ের শিকার শাহরুখ খান প্রতিবাদী হয়ে উঠেন এবং মালিকের সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৯৭ সালে।

কালা পাহাড়,

যশ চোপড়া পরিচালিত এই ছবিটি মুক্তি পায় ৯৭৯ সালে। এখানে অভিনয় করেছিলেন অমিতাভ বচ্চন, শশী কাপুর, শত্রুঘ্ন সিনহা। নায়িকা হিসেবে ছিলেন রাখী, পারভিন ববি ও নীতু সিং। ছবিটিতে কয়লা খনির শ্রমিকদের জীবনচিত্র তুলে ধরা হয়েছিলো। ছবিটি সেরা পরিচালক, সেরা নায়ক ও নায়িকাসহ মোট ৯টি বিভাগে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার জিতেছিলো।

সারেং বউ,

অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও শ্রমিকদের পটভুমিকে কেন্দ্র করে সিনেমা নির্মান হয়েছে। যদিও বর্তমানে এই সিনেমাহার বহুল অংশে কমে গেছে। ১৯৭৮ সালে মুক্তি পায় “সারেং বৌ”। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন সংগ্রামের গল্পে নির্মিত এই ছবিটিতে অভিনয় করেছেন ফারুক, কবরী, আরিফুল হক, জহিরুল হক, বিলকিস, বুলবুল ইসলাম, ডলি চৌধুরী সহ আরো অনেকে। ছবিটি পরিচালনা করছেন বাংলাদেশের বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার আবদুল্লাহ আল মামুন। এই ছবিতে আবদুল জব্বারের কণ্ঠে গাওয়া “ওরে নীল দরিয়া আমায় দেরে দে ছাড়িয়া” গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।

পদ্মা নদীর মাঝি,

বিখ্যাত বাঙালি কথা সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত জনপ্রিয় উপন্যাস থেকে ছবিটি নির্মাণ করা হয়েছে। এটি পরিচালনা করেন গৌতম ঘোষ। বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ প্রযোজনায় এতে অভিনয় করেন আসাদ, চম্পা, রূপা ব্যানার্জী, উৎপল দত্ত প্রমূখ। ছবিটিকে প্রান্তিক মানুষের জীবনযাপন নিয়ে অনবদ্য এক নির্মাণ বলে মনে করা হয়। এখানে শ্রমিক হিসেবে অন্যের নৌকায় মাছ ধরে বেড়ানো কুবেরসহ সকল মাঝিদের বঞ্চিত হওয়ার গল্প ফুটে উঠেছে। এখানে আছে জোতদার নিষ্ঠুর মালিক চরিত্ররা। ছবিটি দর্শকের হৃদয় ছুঁয়ে যায় খুব সহজেই।

মন্তব্যসমূহ (০)


Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন