সাম্প্রদায়িক মাফিয়াতন্ত্র ও রাজনৈতিক বাস্তবতা!

সাম্প্রদায়িক মাফিয়াতন্ত্র ও রাজনৈতিক বাস্তবতা!

‘‘আমি তাকে এমন একটি প্রস্তাব দেবো যে, সে তা প্রত্যাখ্যান করতে পারবেনা!’’(১)

প্রখ্যাত মার্কিন সাহিত্যিক মারিও পুজো'র 'গডফাদার' উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র মাফিয়া ডন ভিটো কর্লিয়নির বিখ্যাত সংলাপ।

বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক মাফিয়াতন্ত্রের কুশিলবদের দেখা যায় যে, তারা সব সময় ধর্মের দোহাই দিয়ে সরলমনা মানুষকে ধর্মের কথা বলে ব্ল্যাকমেইল(জিম্মি) করে রাজনৈতিকভাবে শোষণ করতে তৎপর। এদিকে, ধর্মবিশ্বাসের মত সংবেদনশীল বিষয়কে এদেশের অর্ধশিক্ষিত-স্বল্পশিক্ষিত মুসলিম জনগোষ্ঠী এড়িয়েও যেতে পারেন না! দীর্ঘদিন ধরে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী মানুষের ধর্মীয় আবেগকেই নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ফায়দালাভের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। 

তারা আদর্শিকভাবে দেউলিয়া পাকিস্তানের লেজুড়বৃত্তির লক্ষ্যে সৃষ্ট রাজনৈতিক দল বিএনপি’র ছত্রছায়ায় ক্রমাগত ফুলেফেপে মোটাতাজা হয়ে উঠছে। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লক্ষ শহীদ ও ২ লক্ষ সম্ভ্রম হারানো মা বোনের মহান আত্মত্যাগে অর্জিত হয়েছিলো বাঙালির হাজার বছরের আরাধ্য আত্মপরিচয়, স্বাধীনতা, স্বতন্ত্র রাজনৈতিক জাতিসত্তা এবং লাল সবুজের মহান পতাকা। ক্ষমতাসীন অবস্থায় বিএনপি নামের ক্ষমতাচর্চাকারী রাজনৈতিক দলটি বাঙালি জাতির চিরশত্রু পাকিস্তানের কৃতদাস  যুদ্ধাপরাধী রাজাকারদের হাতে লাল সবুজের মহান পতাকাকে বিকিয়ে দিয়েছিলো।

পাকিস্তানের আজ্ঞাবহ কৃতদাস রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে ভুলুণ্ঠিত করার চক্রান্তে অবৈধভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকারী ক্ষমতালিপ্সু, সামরিকবাহিনীতে চাকরিরত হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক ও কর্মকর্তাকে মনগড়া মার্শাল কোর্টে মৃদ্যুদণ্ডাদেশ দিয়ে হত্যাকারী 'খুনি জিয়া' নামেই অধিক পরিচিত মেজর জিয়াউর রহমান। বাংলা লিখতে ও পড়তে না জানা, বাঙালির প্রতি ন্যুনতম দায়বদ্ধতাহীন মেজর জিয়া, কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানের দালাল রাজাকার শাহ আজিজুর রহমানকে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বানাতেও দ্বিধাবোধ করেননি।

মূলত, এদেশে বিএনপি জামাতের কোনকালেই আওয়ামী লীগ'কে মোকাবিলার মতো সামর্থ্য ছিলোনা। কারণ আওয়ামী লীগ হলো শ্যামল বাংলার পলিমাটির উর্বর নির্যাস থেকে সৃষ্ট গণমানুষের রাজনৈতিক দল। বিভিন্ন সময়ে দেখা গিয়েছে যে, এদেশের কট্টর প্রোপাকিস্তানি চিন্তাধারার সাম্প্রদায়িক মাফিয়া সন্ত্রাসবাদীরা ধর্মের সাইনবোর্ড টানিয়ে পপুলিস্ট পলিটিক্সের চর্চা করে সময়ে অসময়ে সাম্প্রদায়িক হুজুগ ছড়িয়ে সরকারকে জিম্মি করে মোটা অঙ্কের আর্থিক প্রণোদনার দাবি করে আসছে। অথচ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, দেশ ও জাতির কল্যাণে এই ভণ্ড লালসালু(২) মজিদদের দল কোন অবদান-ই রাখেনি! দেশের বিভিন্ন আবাসিক মাদ্রাসায় কোমলমতি ছেলে শিশুদের ধর্ষণের মতো ঘটনা অহরহই ঘটে চলেছে।

ইসলামের নাম ভাঙিয়ে মনগড়া ধর্মীয় অপব্যাখ্যা দিয়ে তারা তুলনামূলক ধর্মীয় আবেগপ্রবণ সদ্য কৈশোর পেরোনো তরুণদের মগজধোলাই করে থাকে। বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে ওয়াজ মাহফিলে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে বয়ান করে থাকেন সুরেলা গায়কী কণ্ঠধারী ও হিন্দিগানের প্যারোডি করতে পটু স্বল্পশিক্ষিত, আধাশিক্ষিত, চাপাবাজ, পরিপূর্ণ ধর্মীয় মূল্যবোধহীন ভুইফোর লেবাসধারী বক্তারা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, ওয়াজের বয়ানে নারীর প্রতি তাদের পশ্চাদপদ দৃষ্টিভঙ্গিজাত কদর্য চিন্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে থাকে।

তাদের বয়ানে বিশ্বমানবতার সম্মানজনক ভালোবাসাপূর্ণ মানবিক সহাবস্থানে তারা বিশ্বাস করেনা, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে কাজ না করে শুধু সাম্প্রদায়িক ঘৃণার বিষ ছড়ানোই যেনো তাদের একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। পাড়া-মহল্লা থেকে ডিজিটাল মাধ্যমে সারা বিশ্বেই এসব অর্বাচীন বক্তাদের ঝগড়াটে দম্ভোক্তিপূর্ণ বয়ানের মাধ্যমে কার্যত তাদের অন্তরের পশুত্বকেই প্রকাশ করে থাকেন । আবার দেখা যায় এসব ধর্মব্যবসায়ী নেতারা পরস্ত্রীকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে বিবাহ বহির্ভূত গোপন অভিসারে গিয়ে রিসোর্টের ৫০১ নম্বর রুম থেকে জনতার কাছে হাতেনাতে ধরা পড়ে।

এই মতলববাজ ভণ্ডের দল ভবিষ্যতে যাতে তরুণ প্রজন্মকে কখনো তাদের নোংড়া অর্থলিপ্সু রাজনীতির গিনিপিগ বানাতে না পাড়ে, সে লক্ষ্যে রাষ্ট্রকে কোমলমতি শিশু কিশোরদের মানসিক বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের প্রতি আন্তরিকভাবে গুরুত্বারোপ করতে হবে। তরুণদের যথাযথ মানবিক বিকাশকে প্রাধান্য দিয়ে প্রাথমিক,মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক,কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপরিকল্পিত পাঠ্যসূচি নির্ধারণ করতে হবে। অসাম্প্রদায়িক মানবিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে নতুন প্রজন্মের মেধা মননের যথাযথ নির্মাণ ও বিকাশের লক্ষ্যে সুপরিকল্পিত সিলেবাস নির্ধারণ করার কোন বিকল্প নেই।

কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, আমাদের দেশের নাগরিকদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থায়,মানসিকতায় , চিন্তাভাবনায় এখনো ব্রিটিশ উপনিবেশিক যুগের প্রবণতা রয়ে গিয়েছে। সারাদেশের সরকারি প্রাথমিক, মাধ্যমিক,  উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল এবং কলেজের আভ্যন্তরিন (শিক্ষকমণ্ডলি, ক্লার্ক, দফতরি) ও বাহ্যিক (প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, মানসম্মত খেলার মাঠ, শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যকর সেনিটেশন সুবিধা ও কমনরুমের নিশ্চয়তা) একাডেমিক পরিবেশ দেশ ও জাতির আগামী দিনের কর্ণধার শিশু-কিশোরদের জন্য কতটা উপযুক্ত তা ভেবে দেখা অতিব জরুরি। সাম্প্রতিক ডিজিটাল বিশ্ববাস্তবতায় ডিজিটাল বাংলাদেশের নাগরিকদের সবার হাতে হাতে রয়েছে স্মার্ট ফোন, হাটে-বাজারে, স্কুল ও কলেজে সর্বত্র তরুণ সমাজের পাশপাশি শিশু-কিশোরদের হাতে হাতেও চোখে পড়ে নামিদামি বিচিত্র সব ব্র্যান্ড ও মডেলের স্মার্টফোন!

যার ফলশ্রুতিতে তরুণরা বিশেষ করে করোনাকাল পরবর্তী শিক্ষা ব্যবস্থায় অটোপাশ ও সংক্ষিপ্ত সিলেবাসের মতো বাস্তবতা তৈরি হওয়ায় শিক্ষার্থীরা তাদের হাতের কাছে থাকা স্মার্টফোনে টিকটক, ফ্রিফায়ার, পাবজি ভিডিও গেমসহ নানা সস্তা বিনোদনের জন্য কার্যত মোহবন্দী হয়ে নিজেদের সময়, উদ্ভাবনী শক্তি ও মেধার অপচয় করে চলেছে। এর ফলে ইতোমধ্যে একটি বইবিমুখ তথা জ্ঞানবিমুখ প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে। এই সুযোগেই প্রতিবছর শীতের মৌসুমে সারাদেশের পাড়া মহল্লায় মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ওয়াজ করে ধর্মের অমোঘ, শ্বাশ্বত, শান্তি সুমধুর বাণীর পরিবর্তে প্রশাসনের নাকের ডগায় ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে চলছে সাম্প্রদায়িক মাফিয়াচক্র।

তারা ধর্মের প্রচার বা প্রসারের জন্য নয় মূলত পপুলিস্টস রাজনীতির ফায়দা লোটার জন্যই ধর্মকে অস্ত্র বানিয়ে প্রান্তিক পর্যায়ের প্রশাসনকে ধর্মীয় আবেগের বেডাজালে জিম্মি করে থাকে । বাংলাদেশের সহজ সরল নাগরিকদের মাঝে ক্রমাগত সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা ও নারীবিদ্বেষ সৃষ্টির মাধ্যমে সুকৌশলে এদেশে সাম্প্রদায়িক মাফিয়াতন্ত্র কায়েম করে চলেছে এযুগের রাজাকার দুর্নীতিবাজ সাম্প্রদায়িক অপশক্তি।

১৯৭২ শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে কুদরত-ই-খুদা কমিশনের প্রতি জাতীয় দিক নির্দেশনা প্রদানকালে মহান স্বাধীনতার স্থপতি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘ঔপনিবেশিক আমলের শিক্ষার জন্য শিক্ষা নয় বা আজ্ঞাবহ কেরানি তৈরির জন্যও শিক্ষা নয়। আমি চাই আধুনিক জ্ঞান ও কর্মশক্তিতে বলিয়ান শিক্ষা ব্যবস্থা।’

রাজনৈতিক দলের সাইনবোর্ডধারী পাকিস্তানের কৃতদাস বিএনপি জামাতের সাম্প্রদায়িক মাফিয়ারা একমাত্র আওয়ামীলীগের ক্ষতি সাধণের জন্য বাংলাদেশের ক্ষতি করতেও দ্বিধাবোধ করেনা।দেশ ও জাতিকে তারা সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের অন্ধকার পথে টেনে নিতে চায়। বাংলাদেশ একটি অগ্রসরমান দেশ হিসেবে এদেশের অধিকাংশ স্বল্পশিক্ষিত অর্ধশিক্ষিত ধর্মপ্রাণ মানুষ ধর্মের পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন সম্পর্কে পরিপূর্ণভাবে জ্ঞাত নয়।

অধিকাংশ ধর্মপ্রাণ জনগণকে ধর্মের দোহাই দিয়ে অনেকটা মোহাবিষ্ট করে ফায়দা লুটে থাকে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটি। তাদের মূল উদ্দেশ্য কিন্তু ধর্মের শান্তি ও সৌহার্দ্যের বাণী প্রচার করা নয়, মূলত রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে দেশকে লুটপাট ও জঙ্গিবাদের অভয়ারণ্য বানানোই তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য। 

যার কদর্য মানবতাবিরোধী ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার স্বরূপ উপলব্ধি করা আবশ্যক। মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকে বর্তমান জামায়েতে ইসলামি ও শিবির (তৎকালিন নাম ছিলো ছাত্রসংঘ) যৌথভাবে রাজাকার, আলবদর ও আল শামস্ গঠন করে এদেশের নিরস্ত্র মানুষের উপর গণহত্যা চালানোর পাশাপাশি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে গণহত্যা ও বাঙালি নারীদের উপর নির্বিচারে গণধর্ষণ পরিচালনায় প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করেছিলো।

সেসময় এদেশের গণমানুষের শত্রু পাকিস্তানিদের এদেশীয় কৃতদাসশ্রেণির প্রতিনিধি হিসেবে রাজাকার, আল বদর, আল শামস্ যুদ্ধাপরাধী রাজাকার বাহিনীর নেতারা সাম্প্রদায়িক মাফিয়াতন্ত্র কায়েম করে এদেশের খেটে খাওয়া নিরীহ মানুষকে পথভ্রষ্ট করার জন্য ইসলামের দোহাই দিয়ে বিশ্বমানবতার শত্রু পাকিস্তানিদের পক্ষাবলম্বন করতে বাধ্য করতো।

সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চেয়ারম্যান মঈনউদ্দীন আবদুল্লার কাছে গত বুধবার শতাধিক বক্তার দুর্নীতির বিভিন্ন তথ্য দিয়ে ‘ধর্ম ব্যবসায়ীদের’ দুর্নীতির তদন্তের আহ্বান জানায় ‘বাংলাদেশে মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস তদন্তে গণকমিশন।’ এতে অবশ্য প্রচণ্ড ক্ষোভ ও আপত্তি জানিয়েছেন তালিকাভুক্ত একাধিক দুর্নীতিবাজ বক্তা। সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা সৃষ্টিকারী এসব ধর্মীয়নেতার সন্দেহভাজন আর্থিক লেনদেন ও বিদেশে অবৈধভাবে অর্থপাচারের তথ্য উঠে এসেছে। যা মূলত এই সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীদের লালসালুর মজিদ চরিত্রটিকেই উন্মোচিত করেছে।

১৯৭৫ সালের ভয়াল ১৫ আগস্ট তারিখে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে এমন-ই এক ধরনের মাফিয়াতন্ত্র ঢুকে পড়েছে যার নাম হলো 'সাম্প্রদায়িক মাফিয়াতন্ত্র'। কেননা সাম্প্রদায়িক অপশক্তি এদেশের সহজ সরল মানুষকে ব্রেনওয়াশ করে এমনভাবে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের বীজ বপন করে যা প্রথম দিকে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধর্মভীরু নাগরিকরা অগ্রাহ্য করতে পারেনা। 

উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে দেশব্যাপী সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস/দাঙ্গা সৃষ্টি করে রাজনৈতিক ফায়দা আদায়ের জন্য গত দূর্গাপূজায় কুমিল্লায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজামন্ডপে পবিত্র কোরান রেখে আসতেও দ্বিধাবোধ করেনি সাম্প্রদায়িক অপশক্তি দ্বারা পরিচালিত জনৈক মুসলমান নামধারী সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসী ! যা নতুন প্রজন্মের কাছে অভূতপূর্ব ঘটনা হলেও সাম্প্রদায়িক অপশক্তি বহুকাল ধরেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনকে কলুষিত করে চলেছে।

এদেশের পাকিস্তানি কৃতদাস বিএনপি জামাতের সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীরা বাংলাদেশকে পিছিয়ে দিতে, লালসবুজের মহান পতাকাকে খামচে ধরে খুবলে নেয়ার জন্য বহুকাল ধরে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র, প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ অপতৎপরতা অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাচ্ছে। একাত্তরের পরাজিত শক্তি বাঙালির শ্রেণিশত্রু যুদ্ধাপরাধী রাজাকার ও তাদের কুলাঙ্গার উত্তরসুরীরা এখনো বাংলাদেশবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তাইতো তারা প্রায়ই বাংলাদেশের অর্থনীতির সাথে কোন মিল না থাকা সত্ত্বেও ভঙ্গুর অস্থিতিশীল সম্পূর্ণ পর্যটন নির্ভর অর্থনীতির দেশ শ্রীলঙ্কার দুরবস্থার সাথে বাংলাদেশের তুলনা করে স্বর্গসুখ খুঁজে পায়।

দেশমাতৃকার প্রতি ন্যুনতম ভালোবাসা ও অনুরাগ জাগ্রত থাকলে বিএনপি কখনোই লবিস্ট নিয়োগ করে দেশের বৈদেশিক ঋণ সহায়তা বন্ধ করে দেয়ার অপতৎপরতা চালাতো না। বিদেশী জঙ্গিদের সাথে গোপন আঁতাত রেখে দেশের সার্বভৌমিক সত্তাকে হত্যার চেষ্টা করতোনা। দেশের উন্নয়নকে বাঁধাগ্রস্থ করতে,  দৃশ্যমান পদ্মাসেতু প্রকল্পকে নস্যাৎ করতে বিএনপি জামাত বিদঘুটে কুসংস্কারাচ্ছন্ন মধ্যযুগীয় কায়দায় মিথ্যাচার ও কল্লাকাটার গুজব সৃষ্টি করে দেশের একাধিক স্থানে বিশৃঙখলা করে মানুষ হত্যা করতে পারতোনা ।

পদ্মাসেতু যাতে হতে না পারে, বাংলাদেশের মানুষ জাতে শিক্ষিত উন্নত হতে না পারে সেই প্রোপাকিস্তানি এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিএনপি জামাত হেন বাংলাদেশবিরোধী কাজ নেই যা করেনি! বাংলাদেশ কিংবা প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারতে যেকোন ধরনের সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় উভয়ক্ষেত্রেই এককভাবে ভুক্তভোগী হয়ে থাকেন দেশের সংখ্যালঘু (যদিও বাংলাদেশের সব নাগরিকই সাংবিধানিকভাবে সমান মর্যাদা পেয়ে থাকেন) নাগরিক সমাজ, বিশেষ করে ভারতে মুসলমানগণ; আর, বাংলাদেশে সনাতন ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী নাগরিকগণ ভয়ানক সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসবাদি আগ্রাসনের শিকার হয়ে থাকেন।

এই সাম্প্রদায়িক মাফিয়াতন্ত্রের শেকড় খুঁজতে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে ১৯৪৭'র দেশভাগের পূর্বাপর এই অঞ্চলের রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রাজনৈতিক প্রভাবে ব্রিটিশ বেনিয়ারা অনেকটা বাধ্য হয়েই উপমহাদেশ ছেড়ে যায়। তাই ভারতীয় উপমহাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়াকে চিরকাল শোষণের লক্ষ্যে ব্রিটিশরাজ শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক উত্থাপিত লাহোর প্রস্তাবকে অগ্রাহ্য করে। ব্রিটিশদের পদলেহনকারী মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ’র মানবতাবিবর্জিত ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’ তথা সাম্প্রদায়িক বিভাজনের মধ্য দিয়ে এদেশের জনমনে সাম্প্রদায়িক ঘৃণাবোধের বিষবৃক্ষ রোপন করেছিলো । যা ছিলো প্রকৃত অর্থে ব্রিটিশদের ঘৃণ্যতম উপনিবেশিক ‘Divide and Rule’ নীতিরই নামান্তর !

হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার করুণ মানবিক বিপর্যয় প্রসঙ্গে উপমহাদেশের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক শাদাত হাসান মান্টো লিখেছেন, ‘‘এটা বলোনা যে ১ লাখ হিন্দু ও ১ লাখ মুসলমান মরেছে; বরং বলো ২ লাখ মানুষ মরেছে! আর এটা অত বড় ট্রাজেডিও নয় যে ২ লাখ মানুষ মরেছে! আসল ট্রাজেডি হলো এই যে, ঐ মারাপড়া মানুষদের কেউ-ই কারো(হিন্দু ধর্ম কিংবা ইসলাম ধর্ম) খাতায় সংযোজিত বা বিয়োজিত হয়নি !

১ লাখ হিন্দুকে মেরে মুসলমানরা হয়তো ভেবেছিল হিন্দু ধর্ম মরে গেছে!কিন্তু তা এখনোও টিকে আছে এবং ভবিষ্যতেও টিকে থাকবে।  অন্যদিকে, ১ লাখ মুসলমানকে মেরে হিন্দুরা হয়তো এটা ভেবে বগল বাজিয়েছিলো যে, ইসলাম ধর্ম শেষ হয়ে গেছে! তবে বাস্তবতা হলো এই যে, তাতে ইসলামের গায়ে কোন রকম আচর-ও লাগেনি। সেইসব লোক তো মুর্খ যারা মনে করে যে, বন্দুক দিয়ে ধর্মকে শিকার করা যায়! তরিকা, ধর্ম, ঈমান, বিশ্বাস এইসব বিষয়গুলো মানুষের দেহে নয় আত্মায় থাকে। ছুরি, চাকু;আর, বন্দুক দিয়ে তা ধ্বংস করা যায়না।’’(৩)

বীর বাঙালির গর্বিত উত্তরাধিকার হিসেবে বাংলাদেশের নবতারুণ্যকে একটি প্রগতিশীল,উন্নত, অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে শপথগ্রহণ করতে হবে। 

শেকড়সন্ধানী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তারুণ্যের মন ও মগজে ধারণ করতে হবে আউল বাউল লালনের দেশ, জারি, সারি, মুর্শিদী ও ভাটিয়ালি গানের দেশ ,বারো মাসে তেরো পার্বণের দেশ, ষড়ঋতুর দেশ, লাখো শহীদের রক্তস্নাত শ্যামল প্রকৃতির লীলাভূমি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাকে।

আমাদের সকলের প্রাণ ও মনের চিরন্তন স্লোগান হোক 'বিদ্রোহী' কবি হিসেবে বিশ্ববিখ্যাত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের অমরগাঁথা,

‘‘হিন্দু না ওরা মুসলিম এই জিজ্ঞাসে কোন জন হে, 

কাণ্ডারি বল ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মা’র”(৪)

#রেফারেন্সসমূহ:

(১)গডফাদার, মারিও পুজো,

(২) লালসালু, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ্,

(৩) সাহায়, মান্টোকে আফসানে, শাদাত হোসেন মান্টো

(৪) কাণ্ডারী হুশিয়ার, সর্বহারা, কাজী নজরুল ইসলাম।

#লেখক: 

ইয়াসির আরাফাত-তূর্য,

সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

মন্তব্যসমূহ (০)