নওগাঁর মহাদেবপুর ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের কারাম উৎসব অনুষ্ঠিত

নওগাঁর মহাদেবপুর ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের কারাম উৎসব অনুষ্ঠিত

নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার বকাপুর, জৈন্তাপুর ও জোয়ানপুর গ্রামসহ নিয়ামতপুর বুধুরিয়া ও লক্ষ্মীডাংগা গ্রামে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে গত দুই দিনব্যাপী কারাম উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে।

উৎসবের প্রথম দিনে সোমবার (২০ সেপ্টেম্বর) উপোস ছিলেন এ অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীরা। পরে সন্ধ্যা গড়ালে কারাম গাছের (খিল কদম) ডাল বেদিতে বসানোর পর শুরু হয় পূজা। এরপর দিয়াবাতি, ফলমূল ও নিজেদের বানানো পিঠা দিয়ে সজ্জিত ডালা বা থালা সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশে পূজার বেদিতে উৎসর্গ করেন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারীরা। এ দিন রাত একটু গভীর হতেই শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা গ্রামের পূজাস্থানে জড় হতে থাকেন। পরে সেখানে একজন পুরোহিত নতুন প্রজন্মের কাছে কিচ্ছা আকারে কারাম পূজার উদ্দেশ্য তুলে ধরেন। কিচ্ছা বলা শেষ হলে উপোস থাকা নারীরা পরস্পরকে খাবার আমন্ত্রণ জানিয়ে উপোস ভাঙেন।

এরপর বেদীতে পুঁতে রাখা কারাম ডালের চারপাশ ঘুরে ঘুরে ঢাক-ঢোল ও মাদলের বাজনার তালে তালে নৃত্য পরিবেশন করেন আদিবাসী তরুণীরা। প্রথম দিনের পূজা পর্ব শেষে মঙ্গলবার মহাদেবপুরের নাটশাল মাঠ এবং নিয়ামতপুরের বুধুরিয়া মাঠে সাংস্কৃতিক মিলনমেলার আয়োজন করা হয়। এই মেলায় নওগাঁর মহাদেবপুর, নিয়ামতপুর উপজেলা ছাড়াও জেলার অন্যান্য উপজেলা এবং বাইরের জেলায় বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক দলগুলো অংশ নেয়। এরমধ্যে মহাদেবপুর ডাক-বাংলো মাঠে ১৭টি, নাটশাল মাঠে ১২টি সাংস্কৃতিক দল এবং নিয়ামতপুরের বুধুরিয়া মাঠে ৮টি সাংস্কৃতিক দল নিজ নিজ জাতিগোষ্ঠীর ঐতিহ্য তুলে ধরে ঢাক-ঢোল, মাদল ও করতালের (ঝুমকি) তালে নাচ ও গান পরিবেশন করেন। নাচে-গানে ও ঢোল-মাদলের আওয়াজে মাতোয়ারা হয় নাটশাল ও বুধুরিয়া মাঠ। লাল-হলুদ শাড়ি আর খোপায় রঙিন ফুল দিয়ে এ সময় মাদলের তালে কারাম উৎসবে মাতোয়ারা হয় নওগাঁর ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক গোষ্ঠীগুলো।

এবার নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার নাটশাল ও ডাক-বাংলো মাঠ এবং নিয়ামতপুর উপজেলার বুধুরিয়া মাঠে কারাম মেলার আয়োজন করা হয়। মেলায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী মানুষের নাচ ও গান উপভোগ করেন হাজারো মানুষ। সমতলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী মানুষের গ্রামে গ্রামে কারাম বৃক্ষের (খিল কদম) ডাল পূজাকে কেন্দ্র করে এই উৎসবের আয়োজন করা হয়। ধর্মীয় বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান পালনের মাধ্যমে উৎসবে সৃষ্টিকর্তার কাছে মনের কামনা-বাসনা পূরণের লক্ষ্যে প্রার্থনা করা হয়ে থাকে। এ ছাড়া নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতি আন্দোলনের অংশ হিসেবে বেশ কয়েক বছর ধরে জাতীয় আদিবাসী পরিষদসহ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বিভিন্ন সংগঠনগুলো এই পূজাকে ঘিরে নওগাঁর বিভিন্ন অঞ্চলে মেলার আয়োজন করে আসছে।

এ অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী মানুষদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বর্ষায় খাল-বিল ও নদী-নালায় পূর্ণতা আসে। মাঠে মাঠে লাগানো শস্যখেত গাঢ় সবুজ রং ধারণ করে। ধান রোপণের পর আদিবাসী সম্প্রদায়ের অফুরন্ত অবসর। ঠিক সেই ভাদ্র মাসে আসে সমতলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী মানুষের অন্যতম বার্ষিক উৎসব কারাম বা ডাল পূজার উৎসব। কারাম উৎসবকে ঘিরে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পল্লীগুলোতে প্রস্তুতি চলে ১৫ থেকে ২০ দিন পর্যন্ত। ঢাক-ঢোল আর মাদলের তালে তালে সৃষ্টিকর্তার প্রতি নাচ-গান উৎসর্গ করার মাধ্যমে নানা কামনা-বাসনা করেন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী নর-নারীরা। কারাম উৎসবকে ঘিরে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী মানুষেরা অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করে থাকেন। ভাদ্র মাসের পূর্ণিমা তিথির তিন থেকে চার দিন আগে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী মানুষ ভূমিতে বীজ রোপণ করেন। পূর্ণিমা তিথির দিন তারা সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পূজার প্রথম দিন উপোস থাকেন।

পূজার দিন দিনের বেলা মাদল, ঢোল, করতাল ও ঝুমকির বাজনার তালে তালে নেচে-গেয়ে এলাকা থেকে কারাম গাছের (খিল কদম) ডাল তুলে আনেন। এরপর তারা একটি পূজার বেদি নির্মাণ করেন। সূর্যের আলো পশ্চিমে হেলে গেলে সেই কারাম গাছের ডালটি পূজার বেদিতে রোপণ করা হয়। পরে পুরোহিত উৎসবের আলোকে ধর্মীয় কাহিনী শোনান। সেই সাথে চলে কাহিনীর অন্তর্নিহিত ব্যাখ্যা। ব্যাখ্যা শেষ হলে বেদির চারপাশে ঘুরে ঘুরে যুবক-যুবতীরা নাচতে থাকেন। এর মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার কাছে নিজেদের মঙ্গল কামনা করেন তারা। এরই অংশ হিসেবে মঙ্গলবার বিকালে বুধুরিয়া মাঠে নিয়ামতপুর উপজেলা আদিবাসী পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক উৎসবে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খাদ্যমন্ত্রী ও নওগাঁ-১ (নিয়ামতপুর, পোরশা ও সাপাহার) আসনের সাংসদ সাধন চন্দ্র মজুমদার। এ ছাড়া মহাদেবপুরের ডাক-বাংলো মাঠে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক উৎসবে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সাংসদ ছলিম উদ্দিন তরফদার।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, কারাম মেলার আয়োজন শুধু নিছক বিনোদনের জন্য করা হয় না। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন ও বিনোদনের পাশাপাশি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার আন্দোলন হিসেবে এর আয়োজন করা হয়। একই সময় বক্তারা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতিও দাবি করেন।

মন্তব্যসমূহ (০)


Lost Password