নওগাঁয় নারীরা পরচুলা দিয়ে ক্যাপ তৈরি করে স্বাবলম্বী

নওগাঁয় নারীরা পরচুলা দিয়ে ক্যাপ তৈরি করে স্বাবলম্বী

নওগাঁয় নারীরা পরচুলা দিয়ে ক্যাপ তৈরি করে স্বাবলম্বী হয়েছে। জেলার মহাদেবপুর ও মান্দা উপজেলার কয়েকটি গ্রামে গড়ে উঠেছে পরচুলা বা ‘হেয়ার ক্যাপ’ তৈরির কারখানা। এসব কারখানায় কাজ করছেন এলাকার দরিদ্র নারী, স্কুল ও কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীরা। পরচুলা তৈরি করে প্রতি মাসে তিন থেকে ছয় হাজার টাকা আয় করছেন তারা।

মহাদেবপুর উপজেলার এনায়েতপুর ইউনিয়নের চকহরিবল্লভ আদর্শ গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গভীর মনোযোগ দিয়ে পরচুলা তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন নারীরা। আশা আকতার, সোনালী আক্তার, তনু খাতুন, শাহানারা খাতুন, মিনা আকতার, শিখা রাণীসহ ৩০ জন নারী দুই মাস ধরে কাজ করছেন এ কারখানায়। তারা সবাই দরিদ্র ও স্কুলপড়ুয়া। প্রতিটি টেবিলে স্ক্রুর সাহায্যে আটকানো আছে প্লাস্টিকের ড্যামি মাথা। ড্যামি মাথার ওপর রয়েছে নেট।

নেটের ফাঁকে ফাঁকে সুচের ফোঁড়ে খুব মনোযোগ দিয়ে আটকানো হচ্ছে একেকটি চুল। ড্যামি পুরো মাথায় সূক্ষ্মভাবে চুল আটকানো সম্ভব হলেই ক্যাপ তৈরির কাজ শেষ। মনোযোগ আর দৃষ্টিনন্দন শৈল্পিক ভাবনা থেকে তৈরি হচ্ছে মনোরম টুপি। প্রতিটি টেবিলে মুখোমুখি হয়ে চারজন কারিগর কাজ করছেন।

কর্মরত কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেলো, ৪ বাই ৪ সাইজের প্রতিটি ক্যাপের মজুরি ৪০০ টাকা, ৫ বাই ৫ সাইজের মজুরি ৬০০ টাকা এবং ৪ বাই ১৩ সাইজের ক্যাপের মজুরি ১৩০০ টাকা। প্রকারভেদে প্রতিটি ক্যাপে ২০ গ্রাম থেকে ৫০ গ্রাম পর্যন্ত চুল লাগে। ক্যাপ তৈরিতে লাগে মাথার ড্যামি, চুল, নেট, সুঁচ, সুতা, চক ও পিন।

এসব উপকরণ ঢাকা থেকে নিয়ে আসেন মহাজনরা। পরচুলা তৈরি করে আবার ঢাকায় পাঠানো হয়। সেখান থেকে রফতানি হয় চীন, জাপান, ভারত, দুবাই, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। পরচুলাকে কেন্দ্র করে মহাদেবপুরের এনায়েতপুর, চকহরিবল্লভ আদর্শগ্রাম, শীবপুর, চকগোবিন্দপুর, গণনপুর, মান্দা উপজেলার সাটইল, সাতবাড়িয়া, চৌবাড়িয়া ও হোসেনপুর, মসিদপুরসহ কয়েকটি গ্রামে কারখানা গড়ে উঠেছে।

সেখানে প্রায় পাঁচ হাজার দরিদ্র নারী, স্কুল ও কলেজপড়ুয়াদের কর্মসংস্থান হয়েছে। তারা এ কাজ করে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। শিক্ষার্থীরা উপার্জিত টাকা নিজেদের কাজে ব্যবহারের পাশাপাশি সংসারে দিয়েও সহযোগিতা করছে। পরচুলা তৈরির আগে সবাইকে দুদিন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

চকহরিবল্লভ আদর্শ গ্রামে পরচুলা কারখানায় কাজ করছে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী সোনালী আক্তার। সে গত এক মাস কাজ করে ১৩০০ টাকা আয় করেছে। সোনালী জানান, তার বাবা একজন দিনমজুর। ট্রাক্টরের বালু বহনের কাজসহ বিভিন্ন কাজ করেন। মা সংসার দেখাশোনা করেন। বাবা-মায়ের অনুমতি নিয়ে সে এ কারখানায় কাজ করছে।

ক্লাস শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত এবং স্কুল ছুটির পর সে কারখানায় কাজ করে। এ কাজ করে যে টাকা পাওয়া যায় তা দিয়ে সংসারে সহযোগিতা করা হয়। গৃহবধূ সানজিদা আকতারের স্বামী দিনমজুর। অভাবের সংসারে দুই ছেলেমেয়ে। বড় ছেলে সপ্তম শ্রেণিতে এবং মেয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। তিনি দুই মাস ধরে এ কারখানায় কাজ করছেন। কাজ করার আগে দুইদিন প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছে। সানজিদা আক্তার বিডিটাইপ নিউজকে বলেন, ‘৫ বাই ৫ সাইজের ক্যাপটি করতে তিনদিন সময় লাগে।

মজুরি পাওয়া যায় ৬০০ টাকা। গত দুই মাসে সংসার সামলিয়ে আট হাজার টাকা পেয়েছি। তবে যে পরিমাণ ক্যাপের চাহিদা মহাজন তা দিতে পারেন না। এরমধ্যে কিছুদিন কাজ বন্ধও ছিল। পরচুলা আসার পর আমাদের মতো হতদরিদ্র পরিবারের সুবিধা হয়েছে।’ মান্দা উপজেলার তেঁতুলিয়া ইউনিয়নের সাটইল গ্রামের মধ্যপাড়ায় পাঁচ মাস আগে হেয়ার ক্যাপ তৈরির কারখানা গড়ে উঠেছে। সেখানে দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী সুবিতা আক্তার রত্না শুরু থেকেই কাজ করছেন।

এ কাজ করে তিনি মাসে আয় করেন প্রায় ৩৫০০ টাকা। তিনি বলেন, করোনার মধ্যে দীর্ঘদিন কলেজ বন্ধ ছিল। তখন সময় বেশি পেতাম এবং কাজও বেশি হতো। একটি ক্যাপ তৈরি করতে তিনদিনের মতো সময় লাগতো। এখন কলেজ চালু হওয়ায় কাজ কম করতে পারছি। তারপরও গত অক্টোবর মাসে ২৫০০ টাকা আয় করেছি। বাবার কাছে টাকার জন্য হাত পাততে হয় না। এ কাজ করে নিজের খরচ চালানোর পাশাপাশি সংসারে টাকা দিয়ে সহযোগিতা করি।

সাটইল গ্রামের কারখানার দলের অধিনায়ক রোশিদা বেগম বলেন, আমার অধীনে ২০ জন ক্যাপ তৈরির কাজ করেন। এরমধ্যে ছয়জনই ছাত্রী। তারা পড়াশোনার পাশাপাশি এ কাজ করেন। এছাড়া গৃহবধূরা সাংসারিক কাজের পাশাপাশি পরচুলা তৈরি করে বাড়তি আয় করেন। তিনি আরও বলেন, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কাজ চলে। মাঝখানে বিরতি দেওয়া হয়। এরপর আড়াইটা থেকে চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত। নিজের কাজের পাশাপাশি সবার কাজ দেখভাল করি।

কারো কোনো সমস্যা হলে শিখিয়ে দেই। এ কাজ করে প্রায় পাঁচ হাজার টাকার মতো আয় হয়। দলের অধিনায়ক হিসেবে তদারকি করায় বাড়তি আরও কিছু টাকা দেন মহাজন। মহাদেবপুর উপজেলা সদরের বাসিন্দা তরুণ উদ্যোক্তা আজাহার ইসলাম সুজন (২৭)। তিনি ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে ছোট ব্যবসা করতেন। এক বন্ধুর পরামর্শে মান্দার হেয়ার ক্যাপ কারখানার মহাজন জামিল হোসেনের সঙ্গে পরিচয় হয়।

কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করলে তাকে কাজ করার অনুমতি দেন মহাজন। চার মাস থেকে এ কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন তিনি। আজাহার ইসলাম সুজন বিডিটাইপ নিউজকে বলেন, আমার ছয়টি হেয়ার ক্যাপ তৈরির কারখানা আছে। যেখানে প্রায় দেড় শতাধিক দরিদ্র নারী ও শিক্ষার্থী কাজ করছেন। কাজেরও ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তবে সে তুলনায় কারিগরদের কাজ দেওয়া সম্ভব হয় না।

তিনি বলেন, হতদরিদ্র নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। এসব কারখানা থেকে মাসে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা আয় হয়। আর এসব ক্যাপ মহাজনরা ঢাকায় পাঠান। পরে তারা চীনসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রফতানি করেন।

মন্তব্যসমূহ (০)


Lost Password