শিল্প সাহিত্য এক অন্যরকম আনন্দ বা সুর। যে সুরের সৌন্দর্যবোধ মনকে ভাবায় স্বপ্ন জাগায় কিন্তু ভোলায় না মনন! শিল্পীর চোখ সব সময় উচ্চতায় ছোট করে দেখেনা। বোধের দেয়াল টপকে সুপ্ত সৌন্দর্য উপস্থাপন করে চিরকাল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, 'থেকে বহু যত্নে আপনাকে বাঁচাতে চায়। লোভীর ভিড় তাড়াবার জন্য সে অনেক সময় কঠোরকে দ্বারের কাছে বসিয়ে রাখে। এমনকি অনেক সময় কিছু বিশ্রী, কিছু বেশুর সঙ্গে মিশিয়ে দেয় কেননা তার সাহস আছে। 'সত্যি শিল্পী তা পারেন করেন অত্যন্ত যত্ন নিয়ে।
আর তা ঘটে বলে শত শত বছর পরেও একজন শিল্পী প্রাসঙ্গিক থাকেন।
রবীন্দ্রনাথের শক্তিশালী কলমের মুখে বাংলার জনগণের মুখে অসাধু ভাষা সাধুতার সম্মান অর্জন করে। আর ভাষা সাহিত্যকে আভিজাত্য দেয়।প্রসঙ্গত এক জায়গায় লিখেছেন -'সাহিত্যে ধনী বা দরিদ্রকে বিষয় করা দ্বারায় তার উৎকর্ষ ঘটে না,ভাবভাষাভঙ্গি সমস্তটা জড়িয়ে একটি মূর্তি সৃষ্টি হলো কি না,এইটেই লক্ষ্য করবার যোগ্য। 'তুমি খাও ভাঁড়ে জল আমি খাই ঘাটে'-দারিদ্র দুঃখের বিষয় হিসাবে এর শচিনীয়তা অতি নিবিড় কিন্তু কাব্য হিসাবে অনেকখানি বাকি রইল। 'তার অধিকাংশ রচনায় এই রূপে উদাহরণ হাজির করা যাবে হাজারো। বস্তুত গতভাবে আকার আকৃতিতে ধর্মে বর্ণে শ্রেণী বৈষম্য ধরে চিন্তার প্রকাশ ঘটেছে। ভাষার ভেলায় বহমান কালের বারতা, সমাজ ও মানুষের জীবন নিয়ে সাজিয়েছেন রবির কুঠিবাড়ি।
ব্রাহ্মণ ধর্মগুরু দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সারদা দেবীর সন্তান রবীন্দ্রনাথ। শুরু থেকেই প্রথাগত শিক্ষার উপর ছিল অনীহা। বাড়িতে গৃহশিক্ষকের কাছে প্রাথমিক পাঠ। তবে আর্থিক দিক দিয়ে থাক বেড়ে উঠায় ছিল না কোনো প্রাচুর্যতা। পরবর্তীকালে ইংল্যান্ডে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করতে গিয়েও শেষ করতে পারিননি।কারণ,রবির মন বরাবরই ছিল সাহিত্য অনুরাগী। তাই বিদেশে ইংরেজি সাহিত্যের সংস্পর্শে থাকায় ভাবনার দরজা খুলে গিয়েছিল।১৯১৩ সালে গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ অনুবাদ করার মধ্য দিয়ে পেয়ে যান নোবেল পুরস্কার। বলা যায়- বাংলার সাহিত্য, সমাজ থেকে শুরু করে বিশ্বের ইতিহাসের পাতায় নিজের জায়গা করে নিয়েছিলেন সাহিত্যচর্চার জোরে।একাধারে উপন্যাসিক, নাট্যকার,সংগীত স্রষ্টা, চিত্রকর, ছোট গল্পকার, প্রাবন্ধিক অভিনেতা, কণ্ঠশিল্পী ও দার্শনিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । মোটকথা বলতে গেলে বলা যায় - সাহিত্য সংসারে এক আশ্চর্যের নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।সাহিত্য তথ্যতত্ত্বে অসামান্য বিশ্লেষক, কালের ঐক্য সাধক ও সত্য সুরসন্ধানী। দেখা অদেখা ভুবনে কৃতিমান বাসিন্দা হয়ে বর্ণনা করেছেন আত্মবোধের।কাল্পনিক ভাবনায় ও ব্যবহারিক মনের সারা জীবন তাই করেছেন।কল্পনার সিংহদ্বার দিয়ে বস্তুর ভেতরে ঢুকে আন্ত :যোগাযোগ সৃষ্টি,বোধের দেয়াল টপকে মানুষের রসাস্বাদন করে সাহিত্য। বিচিত্রভাবে দেখা মানুষের জীবন ও আমির প্রকাশ স্বতন্ত্র সৃষ্টিতে সমৃদ্ধ করেন স্রষ্টাকে।এই প্রক্রিয়াকে রবীন্দ্রনাথ প্রকাশ করেছেন অপূর্বভাবে।'বিশ্বের জিনিস বিশ্বকে দিতেছে কিন্তু তাহার মধ্যে নিজের একটা রস যোগ করিয়ে দিতেছে,নিজের নিজের একটা রূপের পাত্রে তাহাকে ভরিয়া দিতেছে।' আসলেও সব কিছু আছে কেবলমাত্র যোগ উপাদান রুপ রস মসলা ও অলংকার।এই প্রক্রিয়াকে রবীন্দ্রনাথ প্রকাশ করেছেন অপূর্বভাবে।'বিশ্বের জিনিস বিশ্বকে দিতেছে কিন্তু তাহার মধ্যে নিজের একটা রস যোগ করিয়ে দিতেছে,নিজের নিজের একটা রূপের পাত্রে তাহাকে ভরিয়া দিতেছে।' আসলেও সব কিছু আছে কেবলমাত্র যোগ উপাদান রুপ রস মসলা ও অলংকার।
এই প্রক্রিয়াকে রবীন্দ্রনাথ প্রকাশ করেছেন অপূর্বভাবে।'বিশ্বের জিনিস বিশ্বকে দিতেছে কিন্তু তাহার মধ্যে নিজের একটা রস যোগ করিয়ে দিতেছে,নিজের নিজের একটা রূপের পাত্রে তাহাকে ভরিয়া দিতেছে।' আসলেও সব কিছু আছে কেবলমাত্র যোগ উপাদান রুপ রস মসলা ও অলংকার।দূঃখ বেদনা অব্যক্ত যন্ত্রণা জীবনের গল্প দেয় ঘরে বাইরে। প্রকাশ করে সৃজন সাহিত্যের মাধ্যমে।বাঙালির আনন্দ ও অনুপ্রেরণার নাম রবীন্দ্রনাথ। যে কোনো সময়ে যে কোনো জায়গায় চোখ বন্ধ করলেই তার ভালোবাসার সুর সঙ্গ দেবে।কি গানে,কি কবিতায়,কিংবা প্রবন্ধের চিন্তা চেতনায়। কেবল তাই নয়- নিজের পায়ে দাঁড়ানোর,আত্মপরিচয়ের জীবন যাপন করা তথা স্বাভাবিকতা ও সৃষ্টিশীলতাকে বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় যে প্রতিরোধ তার জন্য রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সমাজ ও রাজনীতি সচেতনতা রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যকে মূল্যবান করে তুলেছেন। না হলে অনেক কিছু কল্পনায় থেকে যেত- বাস্তবতার খাতায় আসতো না।পরাধীনতার ঘাত-প্রতিঘাত দেখেছেন কবির চোখে। কিন্তু যখন তিনি লিখেছেন কেবলমাত্র কবির চোখে নয়- তীক্ষ্ণ দৃষ্টি,সামাজিক সমিকরণ ও জীবন অভিজ্ঞতার ভেতর বাইর উপস্থাপন করেন। হাজির করেন সংকট সম্ভাবনা, রুপ রস মাত্রা- তথ্য তত্ত্ব প্রমাণ পরিসংখ্যান নির্মম বাস্তবতা। বিশেষ করে তা ঘটে কথা সাহিত্যে ও বক্তৃতায়।
গোরা(১৯১০),ঘরে বাইরে (১৯১৬),যোগাযোগ (১৯২৯) উল্লেখযোগ্য এসব রচনায় এসেছে উপনিবেশের প্রভাব, জাতীয়তা,ধর্ম, নাগরিক, অধিকার, সমাজের বৈষম্য ও মানুষের অসহায়ত্ব। ত্রিচোখে সব কিছুকে দেখিয়ে দিয়েছেন চারপাশ- বিশ্লেষণ করেছেন মনোজগত।বাঙালির জাতির জন্য বড় ঘটনা বঙ্গভঙ্গ। সেই বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের দেখা যায় না রবীন্দ্রনাথকে।তবে সময় তিনি বঙ্গদর্শন পত্রিকার সম্পাদনা করেছেন। গল্প লিখেছেন, ঈশ্বর ও দেশকে নিয়ে নৈবেদ্যের কবিতা গুলো লিখেছেন।ভাবনা তাকে তাড়িয়ে বেরিয়েছে সারাক্ষণ।নিদারুণ হলেও সত্য সবুজ শ্যামল একটি দেশ তিন ভাগে ভাগ হয়েছে। পিছিয়ে গেছে সম্প্রীতি ভালোবাসা ও উন্নত চিন্তায়। গ্রাম শহরে অনেক বড় বড় দালান, রাস্তাঘাট, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় ও দৃশ্যমান সেতু করলেও মাটি মানুষের মিলন হয়নি বঙ্গভঙ্গের পর। আসেনি সামাজিক মুক্তি। আমরা গড়ে তুলতে পারিনি রুচিবোধও।সামাজিক মর্যাদা ও মূল্যবোধের সংকট এ ফেলেছে মাত্র আর সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্পে! সেই দায় এড়াতে পারে না দৃশ্যমান রবীন্দ্রনাথের হালাল উত্তরাধিকারীগণ।কালিদাস তার মেঘদূত বইয়ের ভূমিকায় লিখেছিলেন :আবদার অনুরোধ করতে হয় অগ্রজের কাছে। আমাদের আবদারও তাই অগ্রদূত রবির আকাশে!
মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন