স্তনে চাকা মানেই কি ক্যান্সার?

স্তন একটি বিশেষ ধরনের ঘাম গ্রন্থি। কোটি কোটি ক্ষুদ্র কোষ নিয়ে এটি তৈরি। একটি সুবিন্যস্ত পদ্ধতিতে লসিকার সাহায্যে কোষগুলোর ফাঁকে ফাঁকে আছে চর্বি, ফাইব্রাস টিসু ইত্যাদি। বয়স, শারীরিক গঠন, সামাজিক স্তর, সন্তান সংখ্যা ও স্তন্যদান স্তনের গঠনে প্রভাব ফেলে।

স্তনের যেসব রোগ নিয়ে বেশি লেখালেখি হয়, তার বেশির ভাগ জুড়ে থাকে স্তন ক্যান্সার। স্তন রোগে আক্রান্তের হারও বেড়েছে অনেক বেশি। এ ব্যাপারে প্রচারণা বৃদ্ধি পাওয়ায় মহিলারা আগের চেয়ে সচেতন হয়েছেন। ফলে স্তনের যেকোনো ধরনের সমস্যাকে তারা অনেক ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়েই গুরুত্বের সাথে নেন এবং অজ্ঞতার কারণে ক্যান্সার বলে ভুল করেন। অথচ স্তনের আরো কিছু সমস্যায় প্রায়ই মহিলারা ভোগেন, সেগুলো ক্যান্সার নয়। যথাসময়ে সঠিক চিকিৎসায় এসব সমস্যার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

যেসব মা শিশুকে সঠিক নিয়মে স্তনদান করেন না, কিংবা প্রয়োজনীয় পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করেন না, তাদের স্তনের বোঁটা ফেটে যেতে পারে। এর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে অনেক সময় এ থেকে স্তনে প্রদাহ দেখা দিতে পারে। এর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে অনেক সময় এ থেকে স্তনের বোঁটা থেকে নানা ধরনের তরল নির্গত হয়। কখনো পরিষ্কার পানির মতো, কখনো রক্তমিশ্রিত, কখনো কালো বা গাঢ় রঙের তরল বের হয়। বিভিন্ন ধরনের রোগ থেকে এটি হতে পারে। সাথে স্তনে চাকা হয়ে ফুলে ওঠা, ব্যথা ইত্যাদি উপসর্গ থাকাও অস্বাভাবিক নয়। এগুলো সবসময়ই শুধু ক্যান্সার থেকে হয় তা নয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে রোগ নির্ণয় করে সঠিক চিকিৎসা করা উচিত।

আঘাজনিত কারণে স্তনের চর্বিজাতীয় পদার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েও চাকা তৈরি করতে পারে। আবার শিশুকে দুধ খাওয়ান এমন অনেক মহিলার কোনো কারণে দুগ্ধবাহী কোনো নালী বন্ধ হয়ে সে অংশ প্রদাহ দেখা দিতে পারে। অনেক সময় ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণেও স্তনে প্রদাহ দেখা দেয়। দুগ্ধপোষ্য শিশু থাকলে আক্রান্ত স্তনে দুধ না খাইয়ে ভালো স্তনেই স্তনদান করতে হবে। আক্রান্ত স্তনের দুধ চেপে বা পাম্প করে ফেলে দিতে হবে। ভেতরে পুঁজ জমা হলে অপারেশন করে পুঁজ বের করে উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক খেতে হবে। পুঁজ বের না করে অ্যান্টিবায়োটিক খেলে স্তনে চাকা দেখা দেয়।

আরেক ধরনের স্তনের রোগ হচ্ছে সিস্ট। স্তনের কলা বা দুগ্ধবাহী নালী যেকোনোটি থেকেই সিস্ট তৈরি হতে পারে। আলট্রাসনোগ্রাফি করে এবং পরবর্তীকালে বায়োপসি করে একে ক্যান্সার থেকে পৃথক করা যায়। স্তনের আরেকটি রোগ ফাইব্রোঅ্যাডিনোমা। এটি নির্দিষ্ট চাকার আকারে হাতে ঠেকে এবং হাত দিয়ে পরীক্ষা করতে গেলে খুব নড়াচড়া করে। তবে এতে তেমন ব্যথা হয় না। এগুলো অনেক সময় বেশ বড় আকার ধারণ করে। তখন অপারেশন করে নেয়া হয়। আবার অনেক সময় নির্দিষ্ট কোনো চাকা পাওয়া যায় না। একটা গোটা গোটা ভাব থাকে। একে বলে ফাইব্রোঅ্যাডেনোসিস। প্রদাহ থেকেও স্তনে চাকা হতে পারে। আলট্রাসনোগ্রাফি এবং সূক্ষ্ম সুঁইয়ের সাহায্যে কোষ নিয়ে পরীক্ষা করে রোগ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়।

আপনারা জেনে অবাক হবেন- যক্ষ্মা শুধু ফুসফুসে নয়, স্তনেও হয়। অনেক সন্তানের জননী, যারা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করেন, তাদের মধ্যে এটি হতে দেখা যায়। তবে অনেক অবস্থাপন্ন মহিলারাও এ রোগে আক্রান্ত হন। স্তনে ফোঁড়া হওয়া, সেগুলো ফেটে গিয়ে পুঁজ বের হওয়া, স্বাস্থ্যের অবনতি ইত্যাদি উপসর্গ এ ক্ষেত্রে থাকে। এ ক্ষেত্রেও এফএনএসি এবং আলট্রাসনোগ্রাফি রোগ নির্ণয়ে সহায়ক। যদিও এ রোগ সারতে সময় লাগে, তবে যক্ষ্মা নিরোধক ওষুধ উপযুক্ত পরিবেশে নিয়মমাফিক খেলে রোগী ভালো হয়ে যান।

ওপরে উল্লিখিত রোগগুলো নির্দোষ। আমেরিকান কলেজ অব প্যাথলজি স্তনের ক্যান্সার নয় এমন নির্দোষ রোগের একটি তালিকা তৈরি করেছেন। যাতে দেখিয়েছেন, স্তনের কোন কোন নির্দোষ রোগের থেকে ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা কতটুকু। এতে দেখা গেছে, খুব কম নির্দোষ রোগই পরবর্তীকালে ক্যান্সারে ঝুঁকি বাড়ায়। সাধারণত ব্যথা, স্তনে চাকা অথবা স্তনবৃন্ত দিয়ে তরল পদার্থ বেরিয়ে আসা প্রভৃতি উপসর্গ নিয়ে এসব রোগী আসেন। এসব উপসর্গ কখনো মাসিক ঋতুস্রাবের সাথে সম্পর্কযুক্ত হয়, আবার কখনো সম্পর্ক থাকে না। প্রত্যেক মহিলার উচিত নিজে নিজে স্তন পরীক্ষার নিয়ম শিখে নিয়ে নিয়মানুযায়ী মাসিকের পর মাসের একটি তারিখ নির্দিষ্ট করে নিজের স্তন নিজে পরীক্ষা করা। সন্দেহজনক কিছু হলে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করা। আপনার সচেতনতাই আপনাকে অনাবশ্যক উদ্বেগ এবং ভবিষ্যতে বিপদ থেকে রক্ষা করবে।

 

মন্তব্যসমূহ (০)


Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন