রহিমা বেগমকে কাছে পেয়ে জড়িয়ে ধরে কান্না করেন মেয়েরা

রহিমা বেগমকে কাছে পেয়ে জড়িয়ে ধরে কান্না করেন মেয়েরা

খুলনা নগরের মহেশ্বরপাশার নিজ বাসা হতে নিখোঁজ হওয়া রহিমা বেগমকে (৫২) উদ্ধার করা হয় ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার সৈয়দপুর গ্রাম থেকে। বোয়ালমারী সদর ইউনিয়ন পরিষদে গত ২২ সেপ্টেম্বর বিকেলে গিয়েছিলেন জন্ম নিবন্ধন করার জন্য। সেখানে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যান। রহিমার জিজ্ঞাসাবাদে সন্দেহ হলে তাকে ইউপি সদস্যের কাছে পাঠানো হয়েছিল।

তবে সেখানে তিনি যাননি বলে জানিয়েছেন ইউপি সদস্য মোশারফ হোসেন। নিখোঁজের ২৯ দিন পর উপজেলার সদর ইউনিয়নের সৈয়দপুর গ্রামের কুদ্দুস মোল্যার (৫৫) বাড়ি থেকে রহিমাকে গত রাতে উদ্ধার করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। এ ঘটনায় ওই বাড়ির তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য খুলনা পুলিশ থানা হেফাজতে নিয়েছে। তারা হলেন বাড়ির মালিক কুদ্দুস মোল্যার স্ত্রী হিরা বেগম (৫০), ছেলে আলামিন বিশ্বাস (২৫) ও কুদ্দুস মোল্যার ছোট ভাই আবুল কালামের স্ত্রী রাহেলা বেগম (৪৫)।

তারা এখন খুলনা পুলিশের জিম্মায় রয়েছেন বলে জানা গেছে। কুদ্দুস মোল্যা বর্তমানে বোয়ালমারী উপজেলা ডোবরা জনতা জুটমিলের একজন কর্মচারী। রহিমা গত ১৭ সেপ্টেম্বর এই বাড়িতে আসেন। রবিবার বিকেলে কুদ্দুস মোল্যার মেয়ে সুমাইয়া বেগম বলেন, ‘আমার বাবা চাকরির সুবাদে খুলনা নগরের মহেশ্বরপাশা এলাকায় রহিমা বেগমের বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। গত ১৭ সেপ্টেম্বর রহিমা বেগম আমাদের বাড়িতে আসেন। তবে আমরা শুরুতে তার নিখোঁজের বিষয়টি জানতাম না। ’

রহিমার নিখোঁজের বিষয়টি তার ভাই আলামিন ফেসবুক ও ইউটিউবের মাধ্যমে মরিয়ম মান্নানের স্ট্যাটাস থেকে জানতে পারেন বলে দাবি করেন সুমাইয়া। শুক্রবার (২৩ সেপ্টেম্বর) ওই পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয় জানিয়ে সুমাইয়া আরো বলেন, “বিষয়টি জানতে পেরে ওই ছবিটি রহিমা বেগমকে দেখাই। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, এটা কি আপনার ছবি? ওই সময় রহিমা বেগম হতভম্ব হয়ে বলেন, ‘আমার ছবির মতোই তো লাগতেছে। ’ মরিয়ম মান্নানের স্ট্যাটাসে দেওয়া দুটি মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করা হয়।

রহিমা বেগমের ছেলে মিরাজের স্ত্রী ফোনটি রিসিভ করেন। রহিমা বেগমের বিষয়টি তাদেরকে বললে তারা ওই নম্বরে আর ফোন দিতে নিষেধ করেন। ” সন্দেহ হলে সুমাইয়ার ভাই আল আমিন শনিবার স্থানীয় ইউপি সদস্য মোশারফ হোসেনকে জানান। তিনি খুলনা মহানগরের ২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সাইফুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হন নিখোঁজ হওয়া রহিমা বেগমই ওই নারী। বোয়ালমারী সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আব্দুল হক বলেন, ‘গত ২২ সেপ্টেম্বর রহিমা বেগম আমার অফিসে এসেছিলেন জন্ম নিবন্ধন করার জন্য।

তাকে না চিনতে পেরে ইউপি সদস্যের কাছে পাঠানো হয়। সেখান থেকে রহিমা আর পরিষদে আসেননি। ’ বোয়ালমারী থানার ওসি মুহাম্মদ আব্দুল ওহাব বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘খুলনা থেকে নিখোঁজ রহিমা বেগমকে বোয়ালমারী উপজেলার সদর ইউনিয়নের সৈয়দপুর গ্রামের কুদ্দুস মোল্লার বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি পরিবারের কারো সহায়তায় বোয়ালমারীতে আত্মগোপনে ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ’

বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য খুলনা পুলিশ ভালো দিতে পারবেন বলে তিনি আরো জানান। গত ২৭ আগস্ট রাত ১১টার দিকে মহেশ্বরপাশার খানাবাড়ী হতে নিখোঁজ হন ছয় সন্তানের জননী রহিমা বেগম। রহিমা বেগম সে রাতে তার মৃত প্রথম স্বামীর বাড়িতে দ্বিতীয় স্বামী বেলাল হাওলাদারকে নিয়ে অবস্থান করছিলেন। নিখোঁজ ঘটনার কয়েক ঘণ্টার পর তার ছেলে সাদি বাদী হয়ে দৌলতপুর থানার একটি জিডি করেন এবং পরদিন নিখোঁজ রহিমা বেগমের কনিষ্ঠ কন্যা আদুরী আক্তার অজ্ঞাতদের নামে একটি মামলা দায়ের করেন।

এই মামলার এজাহারে জমিজমা নিয়ে বিরোধের কথা বলে পাঁচজনের নাম উল্লেখ করা হয়। নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের পক্ষ হতে, বিশেষ করে ঢাকা তেজগাঁও কলেজের ছাত্রী মরিয়ম মান্নান খুলনা ও ঢাকায় একাধিক সংবাদ সম্মেলন, মানববন্ধনসহ নানাবিধ কর্মসূচি পালন করেন, যা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে গুরুত্ব সহকারে প্রচারিত হয়। এদিকে পুলিশ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদের হেফাজতে (রিমান্ড) নেয়। পরে পুলিশ রহিমা বেগমের দ্বিতীয় স্বামী বেলাল হাওলাদারকেও গ্রেপ্তার করে হোফাজতে আনে।

প্রথম থেকেই মামলাটি দৌলতপুর থানা পুলিশ এবং র‌্যাব তদন্ত করছিল। এই তদন্ত পছন্দ না হওয়ায় বাদীপক্ষের আবেদনে মামলার তদন্ত পিবিআই খুলনাকে দেওয়া হয়। পিবিআই আত্মগোপনকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করলে বাদী নাখোশ হন। বৃহস্পতিবার (২২ সেপ্টেম্বর) রাত ১১টা ৩৫ মিনিটে মরিয়াম মান্নান তার মা রহিমা বেগমের লাশ পেয়েছেন বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি পোস্ট দেন এবং ময়মনসিংহের ফুলপুরে অজ্ঞাতপরিচয় যুবতির লাশের ছবি দেখে সেটি তার মা বলে দাবি করেন।

শুক্রবার ময়মনসিংহে গিয়ে পরিবারের পক্ষ হতে দাবি করা হয় ওই ৩২/৩৩ বছরে লাশটি তাদের মায়ের। এ দাবি নিষ্পত্তির জন্য আজ (রবিবার) ডিএনএ টেস্ট করার জন্য ময়মনসিংহ পুলিশের আদালতে আবেদন করার কথা ছিল। কিন্তু নিখোঁজ রহিমা বেগম জীবিত উদ্ধার হওয়ায় তার মেয়ে মরিয়ম মান্নানের (ডিএনএ) আবেদন আদালতে করা হবে না বলে জানান ফুলপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন।

মন্তব্যসমূহ (০)


Lost Password