শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা প্রসঙ্গ,দায়ভার নেবে কে

সারাবিশ্ব এখনো করোনার চরম ঝুঁকিতে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে দেখা দিয়েছে করোনা ভাইরাসের নতুন ধরন (ক্ষিপ্ত প্রকৃতির); যা ব্রিটেন, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকার ধরনের সঙ্গে মিল রয়েছে। বাংলাদেশও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে করোনার নতুন ধরন কয়েক জনের মধ্যে ধরা পড়েছে। এছাড়া এখনো প্রতিদিন দেশে করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। গতকালও করোনায় ৭ জনের মৃত্যু ও ৩৬৬ জন সংক্রমিত হয়েছেন। এখনো করোনার সঠিক কোনো চিকিত্সা পদ্ধতিও আবিষ্কৃত হয়নি। টিকা কতটুকু কার্যকর তা এখনো নিশ্চিত নয়।

করোনার এমন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার মধ্যেও সম্প্রতি বেশ কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রাবাস খুলে দেওয়ার দাবিতে আন্দোলনে নেমেছে শিক্ষার্থীরা। তালা খুলে শিক্ষার্থীরা হলে প্রবেশ করছে। স্থানীয়দের সঙ্গে সংঘর্ষের পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তিন দিন আগে তালা ভেঙে হলে ঢুকে পড়েছেন, কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা উপেক্ষা করে তারা এখনো সেখানেই অবস্থান করছেন। হলে একেকটি রুমে অনেক শিক্ষার্থী গাদাগাদি করে থাকেন। এতে একজনের মাধ্যমে অনেকের সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। হলে ফেরার জন্য আন্দোলন শুরু করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও। এই পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাপকসংখ্যক শিক্ষার্থী করোনায় আক্রান্ত হলে এর দায়ভার কে নেবে? আমেরিকা, বৃটেনসহ বিশ্বের অনেক দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার পর ভয়ংকর অবস্থার সৃষ্টি হয়। ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষকরা করোনায় আক্রান্ত হন। অবস্থা খারাপ দেখে ঐ সব দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আবার বন্ধ করে দেওয়া হয়। এমন বাস্তবতায় করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে আগামী ২৪ মে থেকে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি।

বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা বলেন, করোনায় শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে এটা ঠিক। তবে আগে জীবন। তাই সবাইকে সহনশীল হতে হবে। হুজুগে কোনো কিছু করতে গেলে সবাইকে চরম মূল্য দিতে হবে। ঢালাওভাবে সব বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়া হলে দেশে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। এখনো অনেক দেশে যে সব এলাকায় সংক্রমিত বেশি, সে সব এলাকায় লকডাউন দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ সেই পথে যায়নি। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, সরকারের নিয়মনীতি ও নির্দেশনা মেনেই ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কারণ বিশ্ব এখনো করোনার মারাত্মক ঝুঁকিতে। আমরাও ঝুঁকিমুক্ত নই। যে কোনো পদক্ষেপ চিন্তা-ভাবনা করে এগুতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে ধাপে ধাপে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা যেতে পারে। হুট করে ঢালাওভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা হলে ভয়ংকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রী ও অভিভাবকসহ সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী আগে শিক্ষকগণ এবং পরে ২০ বছরের বেশি বয়সি শিক্ষার্থীদের ধাপে ধাপে করোনার টিকা দেওয়া হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিত্সক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যবিধি মেনে ধাপে ধাপে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া যেতে পারে। কারণ অফিস-আদালত সব কিছু খোলা, শিক্ষার্থীরা মনে করতে পারে, আমরা কেন ঘরে বন্দি থাকব? স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক জন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, সারাবিশ্ব করোনা ঝুঁকিতে। আমরা ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছি। এই অবস্থার মধ্যে ঝুঁকি বাড়ানোর সুযোগ নেই। তাই সব কিছু সিস্টেমে ও নিয়মমাফিক করা উচিত। স্বাস্থ্যবিধি মেনে ধাপে ধাপে এগুতে হবে। উত্তেজিত হয়ে কিছু করলে তা ঝুঁকি বাড়িয়ে দেবে। তিনি বলেন, সব শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের এক সঙ্গে টিকা দেওয়া যাবে না। আইইডিসিআরের প্রধান উপদেষ্টা ও জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, এক সঙ্গে সব বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়া ঠিক হবে না। স্বাস্থ্যবিধি মেনে ধাপে ধাপে খুলতে হবে। ঢাকার বাইরে আবাসিক হল আছে এমন দুই একটি বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষামূলকভাবে খুলে দিয়ে দেখার পরামর্শ দেন তিনি।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. খান মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, সারা পৃথিবী এখনো স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে। করোনা ভাইরাসের নতুন ধরন বিভিন্ন দেশে দেখা দিতে শুরু হয়েছে। যেহেতু বিশ্বঝুঁকিতে, তাই আমরাও ঝুঁকিতে আছি। করোনা ভাইরাস বিশ্ব থেকে নির্মূল না হলে একক কোনো দেশ নির্মূল দাবি করতে পারে না। তিনি বলেন, আমাদের দেশে প্রতিদিনই করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যু হচ্ছে। যেহেতু পরীক্ষা কম তাই সংক্রমিত হওয়ার সংখ্যা কম ধরা পড়ছে। অধ্যাপক ডা. খান মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, টিকা নিলে আমি যে করোনামুক্ত তা নয়। নাকে-মুখে ভাইরাস থাকতে পারে, যা অন্যকে সংক্রমিত করতে পারে। আর ভ্যাকসিন কতটুকু কার্যকর তা নিশ্চিত নয়। তিনি বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢালাওভাবে খুলে দেওয়া ঠিক হবে না। করোনার কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে ঠিকই। তবে আগে জীবন, পরে অন্য কিছু। এখনো অনেক দেশে যেসব এলাকায় আক্রান্ত বেশি হচ্ছে, সেসব এলাকায় লকডাউন দেওয়া হচ্ছে।

মুগদা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে করোনা ভাইরাসের নতুন ধরন (ক্ষিপ্ত প্রকৃতির) দেখা দিয়েছে। এটা যে আমাদের দেশে আসবে না সেই নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না। তাই হুজুগে কোনো কিছু করা ঠিক হবে না। দেশের ১ কোটির বেশি সিনিয়র সিটিজেন ঝুঁকিতে রয়েছে। তিনি বলেন, এখনো প্রতিদিন দেশে আক্রান্ত ও মৃত্যু আছে। সবার স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। নইলে সবাইকে চরমমূল্য দিতে হবে।

আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এস এম আলমগীর বলেন, সবাইকে সহনশীল হতে হবে। সরকার বিসিএস পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। করোনার কারণে বিসিএস পরীক্ষার্থীদের বয়সসীমা বাড়ানো হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ করোনার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে করোনার নতুন ধরন দেখা দিয়েছে। বিশ্ব ঝুঁকিমুক্ত না হলে আমরাও ঝুঁকিমুক্ত নই।

মন্তব্যসমূহ (০)


Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন