দাজ্জাল কি এসে গেছে?

করোনাভাইরাস চলাকালীন নানা গুজব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। লকডাউনের সময় মানুষের হাতে রয়েছে অফুরন্ত অবসর।

তাই একশ্রেণির মানুষ অবসরকে কাজে লাগাচ্ছে নানা গুজব রটনায়। অন্যরাও এ সব গুজব সহজেই বিশ্বাস করছেন। খুবই দুঃখজনক ব্যাপার। এভাবে যারা গুজব রটান তাদের মতলব মোটেও ভালো নয়। এ বিষয়টি সর্বসাধারণের বোঝা উচিত।

এ সব গুজবের ভেতর একটি হচ্ছে দাজ্জাল বেরিয়ে পড়েছে। ইসরাইলের কোন্ রাব্বি না কি দাজ্জালের জন্মের সংবাদ দিয়েছে। দাজ্জাল ও ইমাম মাহদি সংক্রান্ত গুজবের কোনো শেষ নেই।

এ যে এই প্রযুক্তির যুগেই শুরু হয়েছে তা নয় বরং প্রথম যুগ থেকেই এ ধরনের গুজব রটানোর চল রয়েছে। সাহাবিদের যুগের পরই এ ধরনের নানা গুজব মুসলিম সমাজে চালু হয়েছে। উমাইয়া ও আব্বাসি যুগে যেমন তার পরবর্তী যুগসমূহেও ইমাম মাহদি ও দাজ্জাল নিয়ে মুসলিম বিশ্বে নানা কথা ছড়ানো হয়েছে।

দাজ্জাল ইমাম মাহদি ও ইসা মসীহ সম্পর্কে আমাদের একটু ভাবা দরকার। এ বিষয়গুলো সম্পর্কে সঠিক বিষয় জানা থাকলে এ নিয়ে ছড়ানো গুজবগুলো আমাদের অস্থির করতে পারবে না। আমাদের অজ্ঞতার কারণে কুচক্রি মহল এ সব নিয়ে এমন সব কথা প্রচার করে যা আমাদের অস্থির করে রাখে।

কেবল সাধারণ মানুষ নয় মাদ্রাসা ছাত্রদের মাঝেও ছড়ানো হয় গুজব। অনেক মাদ্রাসা ছাত্র পড়ালেখা ছেড়ে দিয়েছে। কারণ তাদেরকে বলা হয়েছে যে কোনো সময় দাজ্জাল বের হয়ে পড়বে।

কাজেই পড়ালেখা করে চাকরি-বাকরি করার মতো সময় নেই। ইমাম মাহদির জন্ম হয়ে গেছে। ইমাম মাহদির দলে যোগ দেয়ার জন্য এখনই প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে ইমান নিয়ে কবরে যাওয়া যাবে না।

মুসলিম পণ্ডীতদের মাঝেও আমরা দেখেছি এ সব বিষয়ে বিভিন্নরকম ভাবনা রয়েছে। একদল যারা এ সব বিষয়কে পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন। যেমন ইবন খালদুন, আল্লামা ডক্টর ইকবাল ও বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ নও মুসলিম মুহাম্মাদ আসাদ প্রমুখ মনীষী।

তাদের বক্তব্য হচ্ছে মুহাম্মাদ সা. সর্বশেষ রাসূল। তার মাধ্যমে মানব জাতিকে যা নির্দেশনা দেয়ার তা দেয়া হয়ে গেছে। এখন আর আকাশ থেকে কেউ আসবে না। মানুষের যে কোনো সমস্যা নিজেদেরই সমাধান বের করতে হবে। কোনো ত্রাণকর্তার জন্য বসে থাকার শিক্ষা ইসলাম দেয় না।

দ্বিতীয় দল যারা এগুলোকেই ইসলামের মৌল বিষয় বানিয়ে নিয়েছে। ইমাম মাহদিকে অস্বীকার করলে বা দাজ্জালকে কেউ অস্বীকার করলে তাকে কাফের ঘোষণাও দিয়েছে এরা।

মুহাম্মাদ আসাদ বলেছিলেন পাশ্চাত্য সভ্যতাই হচ্ছে দাজ্জাল। এ ধরনের কথা ভারতের মাওলানা মানাজির আহসান গিলানিও বলেছিলেন। তো এদের কাফির ফতওয়া দিয়ে দিয়েছে।

ইকবাল ও ইবনে খালদুনকেও এরা ইসা আ.-এর অবতরণ অস্বীকার করার কারণে কাফের বলতে দ্বিধা করেনি। এই দ্বিতীয় দলে বিখ্যাত কোনো মনীষী নেই। বর্তমান যুগের উগ্রবাদী বিভিন্ন সংগঠন এ ধরনের মানসিকতা প্রচার করে থাকে।

তৃতীয় দল হচ্ছে এ দুয়ের মাঝামাঝি। ইসলামের শুরুর যুগ থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত মুসলিম মনীষীদের চিন্তা। ইসলামের মৌল স্তম্ভ না হলেও নবীজীর ভবিষ্যৎ বাণী হিসেবে বিভিন্ন সহি হাদীসে এ সব কথার উল্লেখ রয়েছে।

এ সব বিষয়ে কেউ বিশেষ কোনো তাবিল করলে কাফের হবে না। কিন্তু তাবিল বা ব্যাখ্যা সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া গ্রহণযোগ্য হবে না। আমাদের উচিত নয় কারো অপ্রমাণিত ব্যাখ্যা গ্রহণ করা।

কেয়ামত সংঘটিত হবে। কেয়ামতকে কেউ অস্বীকার করলে অবশ্যই ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে। কেয়ামতের বহু আলামতের কথা হাদীসে উল্লেখ রয়েছে। এ সব আলামত এমন নয় যেগুলো প্রকাশ পাওয়ার পর মানুষের মাঝে এ নিয়ে দ্বন্দ্ব হবে।

কোনো একটি হাদীসেও এ কথা নেই যে, হযরত ইসা আ. অবতরণের পর মুসলমানদের মাঝে এই নিয়ে মতানৈক্য হবে যে তিনি ঈসা কি না? অথবা ইমাম মাহদি আসার পর মুসলমানদের পারস্পরিক মতভিন্নতার কথাও পাওয়া যায় না।

দাজ্জালকে নিয়েও কোনো ইখতিলাফের কথা হাদীসে নেই। কেউ দাজ্জাল বের হওয়ার পর দাজ্জালকে অস্বীকার করলে কাফের হয়ে যাবে এমন কোনো কথা নেই হাদীসের কোথাও।

এ সব ফিতনা নিয়ে অতিরঞ্জন সত্যি মন্দ একটি কাজ। এ সব ভবিষ্যৎ বাণীর উদ্দেশ্য হচ্ছে মুসলিমদের মন প্রস্তুত করা। পরিস্থিতি যত মন্দই হোক সর্বাবস্থায় সুদৃঢ় থাকার কথা রাসূল সা. বলতে চেয়েছেন। মুসলিম শরীফের হাদীসে এ বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।

একবার রাসূল সা. দেখলেন সাহাবায়ে কেরাম সন্ত্রস্ত হয়ে আছে। নবীজী জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের ওপর ভয়ের এমন ছাপ দেখতে পাচ্ছি, ঘটনা কি? সাহাবিরা বললেন, দাজ্জালের ভয় পাচ্ছি আমরা।

রাসূল সা. বললেন, দাজ্জাল ছাড়া অন্য আরও ফিতনার ভয় করি আমি তোমাদের উপর। এরপর বললেন, আমি থাকতে যদি দাজ্জাল আসে তাহলে তো আমিই তাকে প্রতিহত করব। আর আমার পরে যদি আসে তাহলে প্রত্যেক মুমিন তার নিজের সুরক্ষার জন্য যথেষ্ট। আর আল্লাহ আছেন মুমিনের সঙ্গে আমার স্থলাভিষিক্ত। সে সিরিয়া ও ইরাকের মাঝ থেকে বের হবে। ডানে বাঁয়ে সে ধ্বংসযজ্ঞ চালাবে। হে আল্লাহর বান্দারা তোমরা সুদৃঢ় থাকবে। [মুসলিম]

দাজ্জালের ফেতনা থেকে বাঁচার পদ্ধতিও রাসূল সা. বলে দিয়েছেন। প্রত্যেক শুক্রবার সূরা কাহাফের প্রথম দশ আয়াত তেলাওয়াত করলেই দাজ্জাল থেকে সুরক্ষা পাওয়া যাবে।

দাজ্জালের কারণে নিজেদের কাজ বন্ধ করা কোনো বুদ্ধিমানের পরিচায়ক বিষয় হতে পারে না। দাজ্জালের চেয়েও ভয়াবহ বিষয় কিয়ামত। যখন সিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে।

রাসূল সা. বলেন, কেয়ামত কায়েম হওয়ার মুহূর্তেও তোমার হাতে যদি একটি গাছের চারা থাকে তুমি চারাটি লাগিয়ে দাও। সিঙ্গায় ফু দেয়া হয়েছে বলে নিজের শুভ কর্ম থেকে বিরত থেকো না। অথচ গাছের চারাটি তো কেয়ামত কায়েম হওয়ার পর আর বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। পাহাড়-পর্বত আসমান-জমিন সবই ধ্বংস হয়ে যাবে।

মূলত রাসূল সা. এ শিক্ষা দিয়েছেন, চরম ও কঠিন সময়েও নির্মাণের মানসিকতা রাখতে হবে। সমাজ বিনির্মাণের চিন্তা করতে হবে আমদের। ধ্বংস নয় গড়ার কাজ করতে হবে আমাদের সবাইকে।

আসুন বেশি বেশি ভালো কাজ করে আমরা আমাদের দুনিয়া-আখেরাত গড়ে তুলি। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আমীন।

মন্তব্যসমূহ (০)


লগইন করুন


Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন