নাম তার সুলতানা পারভীন নীলা ওরফে বৃষ্টি কুমারী পরিচয়ে ৮ বিয়ে, রূপের ফাঁদে নিঃস্ব বহু পুরুষ

নাম তার সুলতানা পারভীন নীলা ওরফে বৃষ্টি কুমারী পরিচয়ে ৮ বিয়ে, রূপের ফাঁদে নিঃস্ব বহু পুরুষ

নাম তার সুলতানা পারভীন নীলা ওরফে বৃষ্টি। তবে নিজেকে পরিচয় দেন ভিন্ন ভিন্ন নামে। কুমারী পরিচয়ে একে একে করেছেন আটটি বিয়ে। তবুও স্বাদ মেটেনি। এ পর্যন্ত নিজের রূপের ফাঁদে ফেলেছেন অনেক সহজ-সরল পুরুষকে। বিয়ের কথা বলে হাতিয়েছেন প্রচুর অর্থ-সম্পদ। গড়েছেন দালান-কোঠা।

শুধু বিয়ের কথা বলেই নয়, মিথ্যা মামলায় ফাঁসাতেন নিরীহ মানুষদের। এভাবে হয়রানি করে তাদের কাছ থেকেও হাতিয়েছেন টাকা। অবশেষে সুন্দর চেহারার অধিকারী এ নারীকে গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

সোমবার দুপুরে খুলনা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে সুলতানা পারভীন নীলা ওরফে বৃষ্টির প্রতারণা ও জালিয়াতিসহ অপকর্মের ফিরিস্তি তুলে ধরেন মো. আব্দুল বাকী। তিনি মহানগরীর নাজিরঘাট এলাকার আব্দুল জলিলের ছেলে। বৃষ্টির ফাঁদে পড়ে বাকীও সর্বস্ব হারিয়েছেন। বৃষ্টির বাড়ি নগরীর সোনাডাঙ্গা আবাসিক এলাকায়। তার বাবার নাম সুলতানুল আলম বাদল।

লিখিত বক্তব্যে মো. আব্দুল বাকী বলেন, বৃষ্টি এ পর্যন্ত আটটি বিয়ে করেছেন। বিয়ের কিছুদিন পর সেই স্বামীকে ছেড়ে দেন। পরে স্বামীর কাছ থেকে দেনমোহরের টাকাসহ বিভিন্ন কৌশলে বাড়ি-গাড়ি হাতিয়ে নেন। বৃষ্টির মূল টার্গেট সম্পদশালী, ব্যবসায়ী, উচ্চপদের চাকরিজীবী ও প্রবাসী পুরুষ। প্রথমে টার্গেট নিশ্চিত করে ধীরে ধীরে কাঙ্ক্ষিত পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন। এরপর নিজের সৌন্দর্য ও কথা দিয়ে আটকে ফেলেন তাদের।

সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়, ১৯৯৯ সালে বৃষ্টির প্রথম বিয়ে হয় মাদারীপুর জেলার হরিকুমারিয়া গ্রামের আব্দুল হাকিম শিকদারের জাপান প্রবাসী ছেলে শাহাবউদ্দিন সিকদারের সঙ্গে। তখন বয়স ছিল তখন ১৫ বছরেরও কম। কিছুদিন যেতে না যেতেই স্বামীর ঘর থেকে টাকা ও স্বর্ণালংকার নিয়ে বেরিয়ে যান তিনি। তার উশৃঙ্খল জীবনযাপন ও মালামাল চুরির ঘটনায় মাদারীপুর সদর থানায় একটি জিডি করেন শাহাবউদ্দিন। যার নম্বর ৭৩৮, ১৯ ডিসেম্বর ১৯৯৯। যদিও ২০০১ সালে শাহাবউদ্দিনের সঙ্গে বৃষ্টির বিচ্ছেদ হয়।

দ্বিতীয় বিয়ে হয় ২০০৫ সালের ৬ মে। বৃষ্টির দ্বিতীয় স্বামীর নাম এসএম মুনির হোসেন। তিনি খুলনা মহানগরীর শেরেবাংলা রোড এলাকার মো. মকবুল হোসেনের ছেলে। তখন নিজেকে ‘কুমারী’ দাবি করে মুনির হোসেনের সঙ্গে এক লাখ টাকার কাবিননামায় বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি।

বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই উশৃঙ্খল জীবনযাপন ও উগ্র আচরণের শিকার হন স্বামী মুনির। একপর্যায়ে স্বর্ণালংকার ও টাকা নিয়ে এ বাড়ি থেকেও বেরিয়ে যান বৃষ্টি। পরে একই বছরের ১০ ডিসেম্বর তাকে তালাক দেন মুনির হোসেন। যদিও পরবর্তীতে তার কাছ থেকে দেনমোহরের টাকা আদায় করতে ২০০৬ সালে মুনির হোসেনের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন এবং পারিবারিক আদালতে মামলা করেন বৃষ্টি।

সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ফের নিজেকে ‘কুমারী’ দাবি করে ২০০৮ সালের এপ্রিলে বিয়ে করেন। এবার খুলনা নগরীর খালিশপুর ওয়ারলেস ক্রস রোডের আব্দুল মান্নানের ছেলে ঠিকাদার মইনুল আরেফিন বনিকে বিয়ে করেন। তবে শর্ত থাকে বিয়ের পর বৃষ্টি নিজের আত্মীয়ের মাধ্যমে বনিকে ইতালি নেবেন। বিদেশে নেয়ার কথা বলে তৃতীয় স্বামীর কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেন। এর কিছুদিন যেতে না যেতেই প্রকাশ পেতে থাকে বৃষ্টির প্রতারণা। একপর্যায়ে তাদের মধ্যেও বিচ্ছেদ ঘটে।

এ ঘটনায় নিজেকে কুমারী পরিচয় দিয়ে প্রতারণার আশ্রয় নেয়ায় বৃষ্টির বিরুদ্ধে মামলা করেন স্বামী শেখ মঈনুল আরেফিন বনি। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে খুলনার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে মামলাটি করা হয়। মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে। তবে যথারীতি টাকা আদায় করতে বনির বিরুদ্ধেও খুলনার বিভিন্ন আদালতে একাধিক মামলা করেন প্রতারক বৃষ্টি।

বনির সঙ্গে মামলা চললেও ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জের ইফতিখার নামে আরেকজনকে বিয়ে করেন সুলতানা পারভীন নীলা ওরফে বৃষ্টি। সেখানেও দাম্পত্য জীবন স্থায়ী হয়নি। একপর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান ইফতেখার। এরপর ২০১২ সালে বিয়ে করেন বাগেরহাটের বাসিন্দা কামাল হোসেনকে। ২০১৭ সালে ইতালি প্রবাসী মাদারীপুরের মোহাম্মদ আজিমকে, ২০১৮ সালে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার মোহাম্মদ রহমানকে এবং সর্বশেষ ২০১৯ সালে খুলনা মহানগরীর নাজির ঘাট এলাকার মো. আব্দুল বাকীকে বিয়ে করেন।

আট নম্বর স্বামী মো. আব্দুল বাকীর সঙ্গে প্রতারণা করায় বৃষ্টির বিরুদ্ধে ঢাকার আদালতে চেক ও টাকা-পয়সা চুরির অভিযোগে মামলা করা হয়। মামলাটি বর্তমানে পিবিআই ঢাকা মেট্রো দক্ষিণ কার্যালয়ে তদন্তাধীন রয়েছে। এছাড়া সিরাজগঞ্জে থাকার সময় ঢাকার একটি ফ্ল্যাট নিজের নামে লিখে না দেয়ায় আরো এক স্বামীকে নারী নির্যাতন মামলায় ফাঁসানো হয়। এছাড়া তাকে হত্যার হুমকিও দেয়া হয়। ওই ঘটনায় প্রতারক বৃষ্টির বিরুদ্ধে ২০১৯ সালের ২ মে সিরাজগঞ্জ সদর থানায় জিডি করা হয়।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে খুলনা মহানগরীর খালিশপুরে নিজের পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরে আফরীন আহমেদ নামে এক আত্মীয়ের বাসায় কিছুদিন থাকেন সুলতানা বৃষ্টি। সেই সুযোগে আত্মীয়ের বাসা থেকে একটি চেকের পাতা চুরি করে অ্যাকাউন্ট থেকে ১০ লাখ টাকা তুলে নেন। ওই ঘটনায় তার বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও চুরির অভিযোগে মামলা করা হয়। মামলাটি বর্তমানে পিবিআই খুলনা কার্যালয়ে তদন্তাধীন রয়েছে।

প্রতারণার শিকার হয়ে সুলতানা পারভীন নীলার বিরুদ্ধে অভিযোগ দেন এসএম মহিবুর রহমান নামে এক স্বামী। তদন্ত শেষে গত বছরের ৩০ জানুয়ারি এসপি বরাবর প্রতিবেদনে দাখিল করেন সিরাজগঞ্জের এডিশনাল এসপি মো. স্নিগ্ধ আকতার।

সেই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সুলতানা পারভীন নীলা নিজেকে কুমারী, বিধবা ও তালাকপ্রাপ্ত দাবি করে কখনো সুলতানা পারভীন নীলা, কখনো সুলতানা পারভীন বৃষ্টি আবার কখনো সুলতানা পারভীন নাম ব্যবহার করে আরো পাঁচটি বিয়ে করেছিলেন। এভাবে একাধিক লোকের সঙ্গে বিয়ে করেন। বিয়ের পর মিথ্যা মামলার ভয় দেখিয়ে স্বামীর কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেন। বৃষ্টির অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে দুই স্বামী মারাও গেছেন।

খুলনা জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ের অনুমোদিত তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সুলতানা পারভীনের নিকাহ রেজিস্ট্রিকারী মাওলানা এএসএম নুরুল হক। যিনি বৈধ নিবন্ধিত নিকাহ রেজিস্ট্রার নয়। অবৈধ নিকাহ রেজিস্টার দিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে বিয়ে পড়াতেন। বিয়ের পর সংসার চালানোর নামে সুকৌশলে নিজের খরচ বাবদ টাকা, দেনমোহর ও স্বামীর থাকা ফ্ল্যাট নিজের নামে করতে বিভিন্নভাবে অত্যাচার চালাতেন। এমনকি বিয়ের কাবিননামায় টাকার অংক পরিবর্তন করে মোটা অংকের টাকা বসিয়ে দেন।

সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী আব্দুল বাকী বলেন, বৃষ্টির বিরুদ্ধে আরো একাধিক অভিযোগ রয়েছে। এরই মধ্যে প্রতারণার মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা না নিলে একের পর এক পুরুষকে ফাঁদে ফেলে সর্বস্ব লুটে নেবে।

এ বিষয়ে সুলতানা পারভীন নীলা বলেন, জালিয়াতির মাধ্যমে বাকী আমাকে বিয়ে করেছে। নিজের স্ত্রীকে তালাক দিয়ে আমাকে বিয়ে করেন। এরপর বিভিন্ন সময় আমার কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে আমার মামলা চলছে। বাকী যেসব অভিযোগ করেছেন সব মিথ্যা। আমার ভাগ্য খারাপ বলে চারটি বিয়ে হয়েছে।

মন্তব্যসমূহ (০)


Lost Password