ঈদযাত্রায় ট্র্যাজেডি: রডের নিচে চাপা পড়ল মান্দার ৯ ফেরিওয়ালার স্বপ্ন, শোকে স্তব্ধ এলাকাবাসী

ঈদযাত্রায় ট্র্যাজেডি: রডের নিচে চাপা পড়ল মান্দার ৯ ফেরিওয়ালার স্বপ্ন, শোকে স্তব্ধ এলাকাবাসী

সন্তানের হাতে ঈদের নতুন জামা তুলে দেওয়া আর মা-বাবার মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন তারা। কিন্তু এক নিমেষেই সেই আনন্দ রূপ নিল চিরতরে বিষাদে। রডবোঝাই ট্রাক উল্টে তার নিচে চাপা পড়ে স্তব্ধ হয়ে গেল ৯টি তাজা প্রাণ।

গত সোমবার (২৫ মে) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার সরাতৈল এলাকায় যমুনা সেতুর পূর্ব সংযোগ সড়কে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই নিহত ১৫ জনের মধ্যে ৯ জনই নওগাঁর মান্দা উপজেলার ভাঁরশো ইউনিয়নের বাসিন্দা; যার মধ্যে একটিমাত্র গ্রামেরই (রাজেন্দ্রবাটি) রয়েছেন ৬ জন তরুণ।

নিহত ৯ জন হলেন ভাঁরশো ইউনিয়নের রাজেন্দ্রবাটি গ্রামের সুলতানের ছেলে তারেক (২১), আব্দুর রশিদের ছেলে আব্দুল বারেক (২৪), আব্দুর রহিমের ছেলে বাদশা (২৮), একাব্বরের ছেলে সোহাগ (২১), শহিদুলের ছেলে রবিউল (২৬) ও সাকিমের ছেলে সাগর (২২)। এছাড়া অন্য দুই গ্রামের নিহতরা হলেন মুশিদপুর গ্রামের মৃত জাফর আলীর ছেলে মইনুর ইসলাম (৩০) এবং পাকুরিয়া গ্রামের আব্দুর রশিদের ছেলে মাইনুল ইসলাম (২৭) ও গিয়াস উদ্দিন (২২)।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নিহতদের অধিকাংশেরই মূল পেশা মৎস্যজীবী। কিন্তু নদী-নালা বা বিলে কাজ না থাকায় অলস সময়ে জীবিকার তাগিদে তারা অন্য পেশা বেছে নেন। মাত্র ১৫-২০ দিন আগে তারা নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের উত্তর নাজিরপুর এলাকায় ফেরিওয়ালার কাজ করতে গিয়েছিলেন। সাইকেলে করে গ্রামে গ্রামে ঘুরে প্লাস্টিকের খেলনা বা বাটির বিনিময়ে ভাঙা মোবাইল আর ফেলে দেওয়া চুল কেনাই ছিল তাদের কাজ। ঈদের ছুটি শুরু হতেই বাড়ি ফেরার ব্যাকুলতা ভর করেছিল তাদের মনে। কিন্তু গণপরিবহনের তীব্র সংকট আর অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে কম খরচে বাড়ি পৌঁছাতে ফেনী থেকে রাজশাহীগামী একটি রডবোঝাই ট্রাকে চড়ে বসেন তারা। লোহার রডের ওপর কাঠের তক্তা বিছিয়ে বসেছিলেন এই অনিরাপদ ঈদযাত্রায়। কিন্তু ঢাকা-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কের কালিহাতী পৌঁছাতেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ট্রাকটি উল্টে যায়। শত শত মণ ভারী লোহার রডের নিচে চাপা পড়ে নিভে যায় এই শ্রমজীবী মানুষদের জীবনপ্রদীপ।

ভাঁরশো ইউনিয়নের রাজেন্দ্রবাটি গ্রামে পা রাখতেই কানে আসে স্বজনদের গগনবিদারী আর্তনাদ। একই গ্রামের ছয় তরুণের এমন আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো গ্রাম যেন এক জীবন্ত লাশের নগরীতে পরিণত হয়েছে। কোথাও অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী তার স্বামীর জন্য, অবুঝ সন্তান তার বাবার জন্য, আবার কোথাও প্রতিবন্ধী মা-বাবা তার একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলের জন্য বুক চাপড়ে কাঁদছেন।

নিহত বাদশা মিয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। জ্ঞান ফিরলেই বিলাপ করে বলছেন,“রাতে দুবার কথা হছে। বেটির (মেয়ে) জন্য খেলনা কিনিছে। সেই খবর শুনে বেটি কত খুশি। বাপে খেলনা লিয়া আয়োচে। এখন হামার ছওয়ালক কী জবাব দিমো? হামার ছওয়াল কাক বাপ বুলা ডাকপে? হামার কী হবে?” বাদশা মিয়ার অবুঝ শিশুটি এখনো বোঝেনি যে, বাবার কিনে আনা সেই খেলনা হয়তো আসবে, কিন্তু তা দেওয়ার জন্য বাবা আর কোনোদিন ফিরে আসবে না।

অন্য নিহত মাইনুর ইসলামের চাচাতো ভাই রবিউল ইসলাম জানান, মাইনুর ছিলেন পুরো পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ঘরে তার বৃদ্ধ ও অসুস্থ মা-বাবা, স্ত্রী এবং তিন বছরের একটি ছেলেসন্তান রয়েছে। মাইনুরের উপার্জনেই চলত সবার ওষুধ আর সংসার খরচ। এই মৃত্যুর পর পুরো পরিবারটি এখন সম্পূর্ণ অচল ও অথৈ সাগরে ভেসে গেল।

আজ মঙ্গলবার (২৬ মে) সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে জেলা ও স্থানীয় প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে মান্দা উপজেলার রাজেন্দ্রবাটি গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন মাঠে জানাজা শেষে একই গ্রামের ৬ তরুণকে পাশাপাশি কবরস্থ করা হয়। দাফন হওয়া ছয়জন হলেন তারেক, বারেক, বাদশা, সোহাগ, রবিউল ও সাগর। এর আগে সোমবার রাতেই অন্য ৩ জন মাইনুর ইসলাম, মাইনুর রহমান ও গিয়াস উদ্দিনের দাফন সম্পন্ন হয়।

জানাজায় নওগাঁ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ডা. ইকরামুল বারী টিপু, নওগাঁ-১ আসনের সংসদ সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান, রাজশাহী বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার ড. আ. ন. ম. বজলুর রশীদ, রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান, নওগাঁর জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলাম ও পুলিশ সুপার তারিকুল ইসলামসহ নিহতদের স্বজন ও স্থানীয়রা উপস্থিত ছিলেন। এই মর্মান্তিক ঘটনার খবর পেয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করে এলাকা পরিদর্শনে আসেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ডা. ইকরামুল বারী টিপু।

এ সময় তাঁর সাথে উপস্থিত ছিলেন মান্দা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আখতার জাহান সাথী, সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাবিল নওরোজ বৈশাখ, মান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খোরশেদ আলম এবং ভাঁরশো ইউপি চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান সুমন প্রমূখ। পরিদর্শনের সময় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে নিহতদের পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা করে আর্থিক অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়।

অপরদিকে, নিহতদের পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে এবং এলাকা পরিদর্শনে আলাদাভাবে আসেন বিএনপির নেতৃবৃন্দ। এ সময় উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও মান্দা উপজেলা বিএনপির সভাপতি এম এ মতীন, সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম চৌধুরী বাবুল, ভাঁরশো ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি গোলাম নবী কাবুল, সাধারণ সম্পাদক গোলাম সাকলাইন চারুসহ দলীয় নেতা-কর্মীবৃন্দ।

মান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খোরশেদ আলম বলেন, “টাঙ্গাইল জেলা পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের সাথে আমাদের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ছিল। আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহগুলো দ্রুত স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে আনার জন্য পুলিশ সব ধরনের সহযোগিতা করেছে।”

এই ঈদ ভাঁরশো ইউনিয়নের মানুষের কাছে আর কোনোদিন আনন্দের বার্তা নিয়ে আসবে না, দিয়ে গেল এক অনন্তকালের ক্ষত।

মন্তব্যসমূহ (০)


Lost Password