দেশজুড়ে

পাতিলভর্তি স্বর্ণের লোভে ‘জিনের বাদশার’!

বগুড়ার শাজাহানপুরের চোপিনগর ঠাকুরপাড়া এক গ্রামে ‘জিনের বাদশার’ খপ্পরে পড়ে নিজেদের ও কয়েকজন প্রতিবেশীর গয়না এবং নগদ টাকা খুইয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন এক পরিবার।

পাতিলভর্তি স্বর্ণ পাওয়ার লোভে তারা গয়না ও টাকা দিয়েছেন। এখন সবাই গয়না ও টাকা ফিরে পেতে ওই দম্পতিকে চাপ দিচ্ছেন।

শুক্রবার বিকালে গ্রাম্যসালিশে আগামী এক মাসের মধ্যে জমি বিক্রি করে এসব ফেরত দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন তারা।এ ঘটনায় গ্রামের কেউ জড়িত থাকতে পারে। তাই ক্ষতির ভয়ে ওই দম্পতি আইনের আশ্রয় নেননি বলে জানান ওই দম্পতি।

সূত্র জানায়, গত ২৮ মার্চ রাত ১২টার দিকে এক প্রতারক কণ্ঠ বিকৃত করে শাজাহানপুর উপজেলার চোপিনগর ঠাকুরপাড়া গ্রামের দরিদ্র কৃষক আকরাম হোসেনের ছেলে দিনমজুর রমজান আলী পলাশ (২১) ও তার স্ত্রী তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা মনিকা আকতারকে (১৯) মোবাইল ফোনে কল দেয়।

নিজেকে জিনের বাদশাহ পরিচয় দেওয়ার পর ওই প্রতারক প্রথমে তাদের সঠিকভাবে নামাজ আদায় করতে বলে। এরপর জানানো হয় তাদের ভাগ্যে স্বর্ণবোঝাই পাতিল আছে। কিছু নিয়ম মেনে চললে এসব পাওয়া যাবে। আর এতে তারা একবারে ধনী হয়ে যাবেন। বিনিময়ে প্রথমে মসজিদে জায়নামাজ দান করার জন্য কিছু টাকা বিকাশ করতে বলে।

পলাশ ও মনিকা প্রলোভনে পড়ে বিকাশের মাধ্যমে কিছু টাকা পাঠান। পাতিলভর্তি স্বর্ণ পেতে তাদের বেশি করে স্বর্ণের গয়না সংগ্রহ করতে বলে। বিয়ে বাড়িতে দাওয়াত খেতে যাওয়ার নামে প্রতিবেশীদের কাছে গয়না ধার করতে বলা হয়। আর এসব কথা অন্যকে বললে স্বর্ণভর্তি পাতিল চলে যাবে এবং তাদের ক্ষতি হতে পারে বলে ভয় দেখানো হয়।

রমজান আলী পলাশ ও মনিকা আকতার প্রতিবেশী লুৎফর রহমানের স্ত্রী মহিমা আকতারের বাড়িতে গিয়ে আত্মীয়ের বিয়েতে যাওয়ার জন্য গয়না চান। মহিমা তাদের কথায় বিশ্বাস করে প্রায় দুই ভরি ওজনের গলার চেইন, কানের দুল ও হাতের বালা দেন।

পাশের মারিয়া গ্রামের করিমের স্ত্রী শাহেনার কাছে গিয়ে একইভাবে গয়না চাইলে তিনি হাতের বালা ও কানের দুল দেন। এ ছাড়া রবির স্ত্রী তমেলা বেগম কানের দুল নেন।

গত ৩১ মার্চ রোববার দুপুরে ‘জিনের বাদশা’ ফোনে পলাশ ও মনিকা দম্পতিকে জানায়, শাজাহানপুর উপজেলার মাঝিড়া এমপি চেকপোস্টের কাছে একটি বৈদ্যুতিক খুঁটির কাছে একটি স্বর্ণের মূর্তি আছে।

পলাশ সেখানে গিয়ে একটি চিপসের প্যাকেটে ‘স্বর্ণের পুতুল’ পান। ‘জিনের বাদশা’ তাদের পুতুলটি একবারের বেশি দেখতে নিষেধ করেন। পুতুলটি বাড়িতে আনার পর তারা লুকিয়ে রাখেন। পুতুল পাওয়ার পর ‘জিনের বাদশার’ প্রতি ওই দম্পতির বিশ্বাস আরও বেড়ে যায়।

‘জিনের বাদশা’ তাদের সংগ্রহ করা স্বর্ণের গয়নাগুলো বাড়ির কাছে ডাঙ্গার পাড়ে শিমুল গাছের নিচে মাটিচাপা দিয়ে সোজা মাঝিড়ার দিকে যেতে বলে। তারা প্রতিবেশীর কাছে ধার করা গয়না ছাড়াও নিজেদের বাড়ির গয়নাও ওই গাছের নিচে মাটিচাপা দিয়ে চলে যান।

পথিমধ্যে জিনের বাদশা তাদের জানায়, আরও ১০ হাজার ২০০ টাকা দিতে হবে। পরদিন দুপুরে তারা প্রতিবেশী আবদুল হকের কাছে সুদের ওপর ওই টাকা ঋণ নেন। এরপর ‘জিনের বাদশার’ দেয়া বিকাশ নম্বরে টাকাগুলো পাঠিয়ে দেন। এরপর থেকে জিনের বাদশার মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।

তারা পুতুলটি স্বর্ণালংকারের কাছে পরীক্ষা করে জানতে পারেন ওটা অন্য কোনো ধাতুর ওপর স্বর্ণের প্রলেপ দেয়া। এতে তারা হতাশ হয়ে পড়েন।

এদিকে বিয়ের দাওয়াত খাবার জন্য ধার দেয়া গয়নাগুলো ফিরে পেতে গৃহবধূরা পলাশ ও মনিকার বাড়িতে এসে চড়াও হন।
প্রতারণার শিকার রমজান আলী পলাশের বাবা আকরাম হোসেন জানান, এ ঘটনার সঙ্গে স্থানীয় কেউ জড়িত আছে। এ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করলে তার ছেলে ও বউমার বড় ক্ষতি হতে পারে তাই তিনি আইনের আশ্রয় নেবেন না। একমাত্র ছেলেকে বাঁচাতে প্রয়োজনে জমি বিক্রি করে গয়না ও টাকা পরিশোধ করে দেবেন।

এ নিয়ে শুক্রবার বাদ জুমা চোপিনগর ঠাকুরপাড়া গ্রামে পলাশের বাড়িতে সালিশ বসে। এ সময় জানানো হয় আগামী এক মাস অর্থাৎ ৫ মের মধ্যে গয়না ও টাকা ফেরত দেবেন। এ নিয়ে লিখিতভাবে চুক্তিও হয়েছে।

এ বিভাগের আরো খবর

Close