শিরোনাম
হোম / বিভিন্ন / ভাগ্যহত আরাকান”নীরব বিশ্ব মানবতা

ভাগ্যহত আরাকান”নীরব বিশ্ব মানবতা

মাহবুব সৈয়দ: এককালে যাদের ছিল স্বাধীন রাষ্ট্র, ক্ষমতা, প্রভাব প্রতিপত্তি! এখন তারাই সন্ত্রাসী বৌদ্ধদের অমানুষিক নির্যাতনের শিকার। মায়ানমারের মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভাগ্য বিড়ম্বনার ইতিহাস যে কাউকে তাড়িত করবে।
ইতিহাস বলে- উপমহাদেশ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় সর্বপ্রথম যে কয়টি এলাকায় মুসলিম বসতি গড়ে ওঠে, আরাকান তার মধ্যে
অন্যতম। রোহিঙ্গারা সেই আরাকানি মুসলমানের বংশধর। ১৬৩১ সাল থেকে ১৬৩৫ সাল পর্যন্ত আরাকানে ব্যাপক দুর্ভিক্ষ হয়। এরপর মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে। ১৬৬০ সালে আরাকান রাজা থান্দথুধম্মা নিজ রাজ্যে আশ্রিত মোঘল সম্রাট শাহজাদা সুজাকে
সপরিবারে হত্যা করে। এরপর শুরু হয় মুসলমানের ওপর তার নিষ্ঠুর অমানবিক অত্যাচার নিপীড়ন। প্রায় সাড়ে তিনশ বছর মুসলমানদের কাটাতে হয় এই দুর্বিষহ অবস্থার মধ্যে। ১৭৮০ সালে বর্মী রাজা বোধাপোয়া আরাকান দখল করে নেয়।
সেও ছিল ঘোর মুসলিম বিদ্বেষী। বর্মী রাজা ঢালাওভাবে মুসলিম নিধন করতে থাকে। ১৮২৮ সালে বার্মা ইংরেজদের শাসনে চলে যায়। তবে ১৯৩৭ সালে বার্মা স্বায়ত্তশাসন লাভের পর বৌদ্ধদের পরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ব্যাপক রূপ নেয় এবং তারা প্রায় ৩০ লাখ মুসলিম হত্যা
করে। শত শত বছর ধরে তারা মায়ানমারে বাস করে এলেও মায়ানমার সরকার তাদেরকে সেদেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। বলা হয় এরা বহিরাগত।অথচ ইতিহাস অনুসন্ধানে দেখা যায় এই উপমহাদেশ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সর্ব প্রথম গড়ে উঠা মুসলিম বসতি ওয়ালা প্রদেশের মধ্যে বর্তমানের আরাকান তথা রাখাইন প্রদেশ ছিল উল্লেখ যোগ্য।
১৪৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আরাকানের স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র। ২০০ বছরের বেশি সময় সেটা ছিল স্থায়ী।১৯৮১ সালে মায়ানমারের সামরিক শাসনকর্তা আরাকান রাষ্ট্রের নাম পরিবর্তন করে রাখাইন প্রদেশ করে, এটা বুঝানো উদ্দেশ্য যে, এ রাজ্য বৌদ্ধ রাখাইন সম্প্রদায়ের, রোহিঙ্গা মুসলমানদের নয়। ১৯৮২ সালে মায়ানমারের সরকার রোহিঙ্গা মুসলিমদের নাগরিকত্ব বাতিল করে দেয় এবং
সরকারিভাবে তাদেরকে সেখানে ‘বসবাসকারী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তাদের ভোটাধিকার নেই। নেই কোনো সাংবিধানিক ও সামাজিক অধিকার। নিজ দেশে পরবাসী তারা। তারা মায়ানমারের অন্য প্রদেশে অনুমতি ছাড়া যেতে পারে না। এক সময় যেখানে রোহিঙ্গারা ছিল সংখ্যাগুরু আজ সেখানে তারা সংখ্যালঘু। বড় আফসোস! আজো এই আধুনিক সভ্যতায় এসেও রোহিঙ্গা সম্প্রদায় ভাগ্য বিড়ম্বনার শিকার।
বার্মা বা মায়ানমার দেশটির রাখাইন রাজ্যে শত শত বছর ধরে বসবাসকারী রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর অস্তিত্বকে অস্বীকার করছে এবং তাদের প্রতিবেশী বাংলাদেশ থেকে আসা বাঙালি অভিবাসী বলে চিহ্নিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। রাখাইন রাজ্যে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করে। তাদের নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকারকে অস্বীকার করছে মায়ানমার সরকার। বর্তমানে লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ করে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু শিবিরে আটক অবস্থায় রয়েছে।
মায়ানমারের সামরিক জান্তা তার অধিবাসী মুসলমানদের জন্য সে দেশকে জাহান্নামের অগ্নিকুণ্ডে পরিণত করেছে। তাদের থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে উপার্জিত সব সম্পদের মালিকানা, নাগরিক অধিকার, মানবিক অধিকার, বেঁচে থাকার অধিকার। মায়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর যুগ যুগ ধরে সে দেশের সরকার চরম জুলুম- নির্যাতন চালাচ্ছে। বার্মার রোহিঙ্গা মুসলমানের কান্নায় পৃথিবীর আকাশ ভারী হয়ে উঠছে।
মুসলিম নারী-পুরুষ ও শিশুরা বাঁচাও বাঁচাও বলে আত্মচিৎকার করছে। মায়ানমারের বর্বর সরকার তাদের উপর নির্যাতনের স্টিম রোলার চালাচ্ছে। হত্যা করছে অসংখ্য নিষ্পাপ শিশু, যুবক, বৃদ্ধাদেরকে। ধর্ষণ করে কলঙ্কিত করছে অসংখ্য মা-বোনদের। বিধবা
করছে হাজারো নারীদের। সন্তানহারা করছে অসংখ্য মাকে। স্বামীহারা করছে অসংখ্য স্ত্রীকে। ভাইহারা করছে অসংখ্য বোনকে।
মজলুম রোহিঙ্গা মুসলমানদের আহাজারিতে পৃথিবীর আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠছে।
হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতনের শিকার হচ্ছে লাক্ষ লাক্ষ রোহিঙ্গা। নিজ দেশে থাকতে না পেরে তারা বাঁচার আশায় থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় সমুদ্র
পথে নৌযানে পাড়ি জমাচ্ছে। জাতিসংঘ সহ অন্যান্য মানবাধিকার সংস্থা রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে সঠিকই বলেছেন, রোহিঙ্গারা পৃথিবীর সবচাইতে বড় নির্যাতিত জনগোষ্ঠী। তাদের গোত্র ও ধর্মের জন্যে তারা মায়ানমারের সংখ্যা গরিষ্ঠ বৌদ্ধ সম্প্রদায় দ্বারা গণহত্যার বলি হচ্ছেন। রোহিঙ্গারা বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে অসহায় ও নির্যাতিত জাতি।এরপরও রোহিঙ্গাদের মানবদিকার প্রতিষ্ঠায় ও.আই.সি জাতিসংঘ বা মুসলিম রাষ্টগুলি এগিয়ে আসছে না।
Facebook Comments

About Kalam Khan

www.myhostit.com