শিরোনাম
হোম / বাংলাদেশ / ঝিয়ের কাজ করে মরিয়ম এবারও মাস্টার্সে ফার্স্টক্লাস

ঝিয়ের কাজ করে মরিয়ম এবারও মাস্টার্সে ফার্স্টক্লাস

ভিক্ষুক মা আর বৃদ্ধ বাবাকে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন। মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। তারপরও দরিদ্রতাকে মাড়িয়ে পরে বাড়ি ঝিয়ের কাজ করে জীবনযুদ্ধে হার না মানা একজন যোদ্ধার নাম মরিয়ম খাতুন।

জন্মের পর থেকে শয্যাশায়ী বৃদ্ধ বাবা আর স্মৃতিভ্রষ্ট আধাপাগল ভিক্ষুক মায়ের জীবনযন্ত্রণাকে সঙ্গী করে খেয়ে-না-খেয়ে বেড়ে উঠেছে যশোরের অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়ার পাঁচকবর এলাকার হতদরিদ্র পরিবারের মেয়ে মরিয়ম খাতুন। অন্যের জমিতে কোনো রকম একটি কুঁড়েঘরে আধাপাগল ভিক্ষুক মায়ের অন্যের বাড়ি থেকে চেয়ে আনা উচ্ছিষ্ট খাবার আর ছেঁড়া ও বাদ দেয়া কাপড় পরে জীবন সংগ্রামে এগিয়ে চলা। সেই মরিয়মই এবার বিএল কলেজ থেকে মাস্টার্সে (রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ) ফার্স্টক্লাস পেয়ে তার কলেজের শিক্ষক ও সহপাঠীসহ গোটা নওয়াপাড়াবাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন।

গত মঙ্গলবার মাস্টার্স পরিক্ষার ফলাফল প্রকাশ হলে মেধা তালিকায় তার ফার্স্টক্লাস অর্জন এলাকাবাসীকে তাক লাগিয়ে দেয়। তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ভাঙা ঘরের এক কোণে জোহরের নামাজ আদায় করছে মরিয়ম। বসতে দেয়ার জায়গা নেই ওদের। লাঠি ভর দিয়ে বেরিয়ে এলেন মরিয়মের বৃদ্ধ বাবা শামছুর শেখ। মেয়ের খোঁজ নিতে আসার খবরে কেঁদে ফেললেন তিনি। কাঁপতে কাঁপতে মাটিতেই বসে পড়লেন বৃদ্ধ বাবা। নামাজ শেষ করে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন মরিয়ম। চোখে পানি টলমল করছে। সালাম বিনিময় করে বসতে দিতে না পারার লজ্জায় স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারছিল না সে। ভালো রেজাল্টের উচ্ছ্বাস এক মিনিটেই মিলিয়ে গেল মরিয়মের। পাশে দাঁড়ানো মা-বাবাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লেন মরিয়ম। ‘আমার মা-বাবা একটু শান্তিতে ঘুমাতে পারে না। তিনবেলা ঠিকমতো খাবার জুটাতে পারি না। রোগের যন্ত্রণায় সারা রাত নির্ঘুম কেটে যায় তাদের। আর সেই যন্ত্রণা আমার সব সাফল্যকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়। আমি কী করব তা ভাবতেও পারি না। স্থানীয়দের সহায়তায় এ পর্যন্ত এসেছি।

জানা গেছে, ওই এলাকার কাইয়ুম আলীর জমিতে ছোট্ট একটি কুঁড়েঘরে মা-বাবাকে নিয়ে বসবাস করেন মরিয়াম। নওয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া শুরু। স্থানীয়দের সহায়তায় ও মায়ের ভিক্ষার টাকায় ২০০৭ইং সালে বাণিজ্য বিভাগ থেকে জিপিএ ৪ পায় এসএসসিতে। ২০০৯ইং সালে নওয়াপাড়া মডেল কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে জিপিএ ৪.১০ পেয়ে এইচএসসিতে, ২০১৫ইং সালে বিএল কলেজ থেকে অনার্সে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ফার্স্টক্লাস পাস করেন এবারো মাস্টার্সে ফার্স্টক্লাস অর্জন করেন। ছোটবেলা থেকেই লেখাপড়ার পাশাপাশি এলাকার বিভিন্ন বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করেন মরিয়ম।

এসএসসি পাস করার পর এলাকার ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের সামান্য পারিশ্রমিকে পড়াতে শুরু করেন, পাশাপাশি চলে ঝিয়ের কাজ। এখনো ঝিয়ের কাজ করতে হয় তাকে। স্মৃতিভ্রষ্ট মাকে আর ভিক্ষা করতে যেতে দিতে চান না মরিয়ম। না জানি কবে রাস্তা ভুলে হারিয়ে যান তার জনম দুঃখিনী মা। তিনি এই সমাজসহ দেশের সরকার প্রধানের কাছে বিনিত অনুরোধ করেছেন কোনো রকম একটি চাকরি আর একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই। তাহলেই পরম তৃপ্তিতে মা-বাবার কোলে মাথা রেখে একটু শান্তিতে ঘুমাতে পারবেন মরিয়ম।

Facebook Comments

About Kalam Khan

www.myhostit.com