শিরোনাম
হোম / বাংলাদেশ / শোকে বাকরুদ্ধ রুপার পরিবার: হাসপাতালে মা, ফাঁসির দাবীতে ফুঁসে উঠছে সিরাজগঞ্জবাসী

শোকে বাকরুদ্ধ রুপার পরিবার: হাসপাতালে মা, ফাঁসির দাবীতে ফুঁসে উঠছে সিরাজগঞ্জবাসী

টাঙ্গাইলের ধর্ষনের পর নৃশংসভাবে হত্যার শিকার কলেজ ছাত্রী রুপার বাড়ীতে চলছে শোকের মাতম। রূপাকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছে পরিবারের সদস্যরা। শোকে মা অসুস্থ হয়ে পড়ায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আদরের বোনকে হারিয়ে বার বার শোকে মুর্ছা যাচ্ছে দুই বোন পপি ও জিয়াসমিন। তাদের করুণ দৃশ্যে এলাকাবাসীর চোখেও ঝরছে পানি। মা-তিন বোন-দুই ভাইয়ের সংসারে একমাত্র উপার্জনশীল হওয়ায় পরিবারটি চোখে-মুখে অন্ধকার দেখছে।

এদিকে দোষীদের দৃষ্টান্তমুলক শাস্তির দাবীতে ফুঁসে উঠছে তাড়াশসহ পুরো সিরাজগঞ্জ জেলার সাধারন মানুষ। নিহত জাকিয়া সুলতানা রুপা তাড়াশ উপজেলার বারুহাস ইউনিয়নের আসানবাড়ী গ্রামের মৃত জেলহক প্রামানিকের মেয়ে। রূপা বগুড়া আজিজুল হক কলেজে অনার্স মাষ্টার্স শেষ করে ঢাকা আইডিয়াল ‘ল’ কলেজে পড়াশোনা করত। পাশাপাশি পড়াশোনা ও পরিবারের ব্যয়ভার বহন করতে ইউনিলিভার কোম্পানীতে চাকুরী করত।

সরেজমিনে রুপার বাড়ীতে গেলে কান্নাজড়িত কন্ঠে রূপার বড় বোন জিয়াসমিন জানান, আকাশ ছোয়া স্বপ্ন ছিল বোন রূপার। স্বপ্ন ছিল লেখাপড়া শেষ করে বড় উকিল হবে। কিন্তু মানুষরূপী হায়েনারা তার সব স্বপ্ন পুরন হতে দিল না। স্বপ্ন পুরনের আগেই পৃথিবী থেকে নির্মমভাবে শেষ করে দেয়া হলো তাকে। জিয়াসমিন বিলাপ করতে করতে বলেন, বৃহস্পতিবার সর্বশেষ রুপার সাথে কথা হয়। আমার অসুখের কথা শুনে বলেছিল, আপা আমি ছুটে পেলেই তোমাকে রাজশাহী হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে দেখাব। আর মাকে ভাল ডাক্তার দেখাব। কিন্তু তা আর হলো না। এখন আমার মাকে ছোট ভাই-বোনকে দেখার মতো কেউ রইলো না।

রূপার ছোট বোন পপি জানান, দুইবোন এক সাথে চাকুরী করতাম। রূপা থাকতো শেরপুরে। আর আমি থাকতাম জামালপুরে। শুক্রবার দিন সকালে আপু ফোন দিয়ে বলল, আমি বগুড়া শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা দিতে যাচ্ছি। পরীক্ষা শেষে আমি ময়মনসিংহ হয়ে শেরপুরে ফিরব। বিকেল ৫টার দিকে বলে আমি ছোয়া পরিবহন গাড়ীতে ওঠছি। রাত আটটার দিকে ফোন দিলে আপু বলে আমি সিরাজগঞ্জ রোডে খাবার খাচ্ছি। আমি তাকে তাড়াশের বাড়ীতে যেতে বলি। কিন্তু আপু বলে অফিসে না গেলে চাকুরী থাকবে না। এ জন্য আবার গাড়ীতে ওঠে। রাত দশটার দিকে আমি ঘুমিয়ে পড়ি। অনেক রাতে আপুর বস আমাকে ফোন দিয়ে বলে রুপার ফোন বন্ধ, তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। সেই থেকে বার বার ফোন করলে আপুর বন্ধ পাই। তারপর ইউনিলিভারের কর্মী দিয়ে খোঁজাখুজি করেও তাকে পায়নি। শনিবার সকালে পত্রিকায় ছবি দেখে মধুপুর থানায় গিয়ে আমার বড় ভাই হাফিজুর থানায় গিয়ে আপুর ছবি দেখে শনাক্ত করেন তাকে।

কান্নাজড়িত কন্ঠে পপি আরও বলেন, বাসের চালক-হেলপাররা আপুকে ধর্ষনের পর নির্মমভাবে নির্যাতন করে হত্যা করেছে। হত্যাকারীদের সরকার যেন এমন শাস্তি দেয় যাতে আর কোন পুরুষ কোন মেয়ের প্রতি এমন নিষ্ঠুর আচরন না করে। কাঁদতে কাঁদতে বলেন, বাবা মারা যাবার পর আপুই আমাদের সবকিছু দেখভাল করত। এখন আপু নেই, আমরা কি নিয়ে বাঁচব?

ছোট ভাইয়ের স্ত্রী জানান, আপু পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ত। তাহাজ্জদের নামাজ পড়ত। এতো ভাল একজন মানুষকে এভাবে মানুষ মেরে ফেলবে কল্পনাই করতে পারি না। যারা আপুকে হত্যা করেছে তারা মানুষ নয়-মানুষরূপী জানোয়ার।

রূপার পাঁচ বছর বয়সী ভাতিজা হুমায়রা খাতুন হিমু বলেন, ফুফি আমাকে খুব আদর করত। চকলেট, জামা-কাপড় কিনে দিতো। এখন আমাকে আর আদর করবে না-কোলেও নিবে না। আমার ফুফুকে যারা হত্যা করেছে তাদের ফাঁসি দাবী করলেন এই ছোট্ট শিশুটিও।

হাসপাতালে বেডে শুয়ে থাকা অসুস্থ মা হাসনা হেনা বার বার মুর্ছা যাচ্ছেন আর বলছেন আমাকে এখন কে দেখবে? কে মা বলে ডাকবে? মেয়ে আমার অনেক বড় অফিসার হতে চেয়েছিল। খুব কষ্ট করে লেখাপড়া করছিল-কষ্ট করে ছোট বোন ও ভাইদের খরচ চালাতো। ছোট ভাইকে প্রতিষ্ঠিত করবে বলে কথা দিয়েছিল। বোনকে ভাল ঘরে বিয়ে দিবে বলে আশা করেছিল। কিন্তু তার কোন আশাই পুরণ হলো না। অশ্রুসিক্ত নয়নে বলেন, আমার মেয়েকে যারা নির্যাতন করে নির্মমভাবে হত্যা করেছে তাদের যাতে ফাঁসি হয়- এখন এটা আমার একমাত্র দাবী। আর এটা যেন আমি দেখে যেতে পারি- এটাই হবে আমার শান্তনা।

প্রতিবেশী ওবায়দুল ও সহপাঠী জানান, গরীব পরিবারের মেয়ে ছিল রুপা। খুব কষ্ট করে লেখাপড়া করছে। এই বয়সেই পরিবারের হাল ধরেছিল। এলাকার ছোট ছোট ছাত্র-ছাত্রীদের খুব প্রিয় ছিল। কোন বিষয়ে ছাত্র-ছাত্রীরা জানতে চাইলে বুঝিয়ে দিতো। তার নিমর্ম হত্যাকান্ডে পুরো গ্রাম মর্মাহত হয়ে পড়েছে। হত্যাকারীদের অবিলম্বে দৃষ্টান্তমুলক শাস্তির দাবী করেছেন তারা।

তাড়াশ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল হক জানান, দেশে এখনো মেয়েরা নিরাপদ নয়। রাস্তাঘাটে প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হচ্ছে মেয়েরা। এর সুরাহা হওয়া প্রয়োজন। রূপা একজন ভাল মেয়ে ছিল। রুপা হত্যা মামলাটি দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করে চার্জশীট প্রদান এবং মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালে স্থানান্তরের মাধ্যমে দ্রুত বিচারকার্য সম্পন্ন করে দৃষ্টান্তমুলক শাস্তির দাবী করেন তিনি।

সিরাজগঞ্জ পুলিশ সুপার মিরাজ উদ্দিন আহমেদ ঘটনাটিকে ন্যাক্কারজনক ও বেদনায়ক উল্লেখ করে বলেন, প্রয়োজনীয় কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য টাঙ্গাইল পুলিশ প্রশাসনের সাথে সার্বক্ষনিক যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে। রুপার পরিবারের পাশে সিরাজগঞ্জ প্রশাসন সবসময় থাকবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

জেলা প্রশাসক কামরুন নাহার সিদ্দীকা জানান, সংবাদ পাবার পরপরই উপজেলা প্রশাসনকে রূপার পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য নির্দেশ দেয়া হয়। তাদের নিরাপত্তাসহ সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।

শাস্তির দাবীতে মানববন্ধন:

কলেজ ছাত্রী রুপা খাতুনকে টাঙ্গাইলে চলন্ত বাসে গণধষর্নের পর হত্যার ঘটনায় সিরাজগঞ্জের সাধারন মানুষ ক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠছেন। প্রতিবাদের ঝড় ওঠতে শুরু করেছে সিরাজগঞ্জে। বুধবার সকালে হত্যার প্রতিবাদে সিরাজগঞ্জ সদর ও তাড়াশে মানববন্ধন কর্মসুচী পালন করা হয়েছে। সকালে তাড়াশ প্রেসক্লাবের সামেন সচেতন নাগরিক সমাজ রূপা হত্যার প্রতিবাদে মানববন্ধন কর্মসুচী পালন করেছে। মানববন্ধন চলাকালে অভিযুক্তদের শাস্তি দাবী করে বক্তব্য রাখেন, জেলা বাসদের সমন্বয়ক নব কুমার কর্মকার, তাড়াশ উপজেলা পুজা উদযাপন পরিষদের সাধারন সম্পাদক তপন গোস্বামী, স্থানীয় এনজিও পরিবর্তনের পরিচালক আব্দুর রাজ্জাক, সাংবাদিক মাসুদ পারভেজ, আতিকুল ইসলাম বুলবুল, সনাতন দাস ও আশরাফুল ইসলাম রনি প্রমুখ। অন্যদিকে একই দাবীতে সিরাজগঞ্জ কোর্ট চত্বরে হদয়ে বন্ধুসভার আয়োজিত মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন সিরাজগঞ্জ টেলিভিশন সাংবাদিক ফোরামের সহ-সাধারণ সম্পাদক সুকান্ত সেন ও সিনিয়র সাংবাদিক খ.ম.একরামুল হক প্রমুখ।

পুলিশ সুপারের অনুদান:

মেয়ে হত্যার খবর শোনার পর পরই অসুস্থ হয়ে পড়েন মা হাসনা হেনা। গুরুত্বর অবস্থায় তাকে তাড়াশ স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। অসহায় মায়ের চিকিৎসার জন্য কেউ এগিয়ে না আসলেও সিরাজগঞ্জ পুলিশ সুপার মিরাজ উদ্দিন আহমেদ চিকিৎসার জন্য দশ হাজার টাকা অনুদান প্রদান করেছেন। দুপুরে তাড়াশ থানার ওসি মনজুর রহমান হাসপাতালে গিয়ে নগদ অর্থ তার পরিবারের হাতে তুলে দেন। তবে আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) স্বাস্থ্যমন্ত্রী আলহাজ্ব মোহাম্মদ নাসিম রুপার বাড়ীতে যাবেন বলে একটি সুত্র নিশ্চিত করেছেন।

লাশ সিরাজগঞ্জে আজ তাড়াশে আসবে:

অজ্ঞাত হিসেবে দাফন করা নিহত রুপার লাশ আদালতের নির্দেশ পাবার পার মধুপুর কবরস্থান থেকে উত্তোলনের পর নিজগ্রামে আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) নিজগ্রাম আসানবাড়ীতে আনা হবে।

মধুপুর থানার ওসি শফিকুল ইসলাম জানান, লাশ উত্তোলনের জন্য আদালতে আবেদন করা হয়েছে। অনুমতি পেলে লাশ উত্তোলনের পর বৃহস্পতিবার পরিবারের লোকজনের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এছাড়াও মামলার তিন আসামী স্বীকারোক্তিমুল জবানবন্দী দেয়ার পর তাদেরকে গতকালই কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে। বাকী দুজনকে জবানবন্দির জন্য আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে।

Facebook Comments

About Kalam Khan

www.myhostit.com