সাইবার অপরাধের শিকারে অধিকাংশ ভুক্তভোগী নারী

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

ডিজিটাল শব্দটির ধারাবাহিকতায় প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে সাইবার অপরাধও। সাইবার অপরাধের বেড়াজালে জড়িয়ে বিপর্যয়ের সাথে সাথে আত্নহত্যার পথ বেঁছে নিচ্ছে অসংখ্য নারী। পঞ্চম সপ্তাহের(৩০-৩১ অক্টোবর) স্লোগান- ‘সাইবার হুমকি থেকে গণসেবামূলক অবকাঠামো রক্ষা’ নিয়ে বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে ‘সাইবার নিরাপত্তা সচেতনতা মাস অক্টোবর-২০১৭’।

রাজধানী ঢাকায় অবস্থিত একমাত্র সাইবার ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলা থেকে জানা যায়, ২০১৩ সালে ট্রাইবুন্যালের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকে গত চার বছরে সাইবার অপরাধের মামলা বেড়েছে প্রায় ২৬২গুণ। সিংহভাগ নিয়ে ৮২ শতাংশ সাইবার অপরাধের শিকার নারী। পর্যালোচনা করলে উঠে আসে, ফেসবুকে নারীদের নিয়ে আপত্তিকর ছবি ও অশ্লীল ভিডিও দেওয়ার অপরাধে সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে  বিতর্কিত সেই ৫৭ ধারায়।

সময়ের ব্যবধানে সাইবার অপরাধের শিকারে নারীদের জীবন বিপর্যস্ত হওয়ার ঘটনা এখন চড়াও। বর্তমান প্রেক্ষিতে, প্রতি ৫ জনে ২ জন নারী সাইবার অপরাধের শিকার হন। কিন্তু সামাজিক মর্যাদা, এমনকি পরিবারের সাথে খোলামেলা আলোচনা না করতে পারার দরুণ তারা চুপ থেকে নিজেদের চার দেয়ালের মধ্যে বন্দি করে নিচ্ছে। অতিষ্ট হয়ে কেউবা বেঁছে নিচ্ছে আত্নহত্যার পথ। বর্তমান প্রেক্ষিতে অপরাধের অধিকাংশ ক্ষেত্রে যে বিষয়টি দায়ী তা হলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্ল্যাকমেইল করা। উঠতি তরুণীরা প্রেমের ফাঁদে পড়ে এই সমস্যাতে বেশি সম্মুক্ষীণ হয়ে থাকে বলে দেখা যায়। এমনকি বিবাহীত দম্পতির বিচ্ছেদের পর ব্যক্তিগত মুহুর্তের ছবি প্রকাশ করার মতো অভিযোগের সংখ্যাও সীমাহীন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রায়পুরা জেলার সাদিয়ার(ছদ্মনাম) বিয়ে হয় পাশের গ্রামের মুসাদ্দির রহমানের সাথে। বিয়ের দেড় বছরের মাথায় বিচ্ছেদের পর সাদিয়ার নামে ফেইক আইডি খুলে মুসাদ্দির। সেখানে সম্পর্কের অন্তরঙ্গ মুহুর্তের ছবি প্রকাশ করতে থাকে, তাতে এলাকাবাসীর তিরস্কারের মুখে পড়ে আত্নহত্যা করতে যায় সাদিয়া। এমন ঘটনার পরও মুখ খুলেনি সাদিয়ার পরিবার, এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের অনুরোধেও থানায় যেতে রাজি হয়নি তারা।

তবে একিরকম মামলার সূত্র ধরে একটি মিথ্যে মামলা পাওয়া যায় নারায়নগঞ্জে। বাদী সুফিয়া তার স্বামী আব্বাসের বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধের মামলা করেন যা সম্পূর্ণ বানোয়াট বলে প্রমানিত হয়। কিন্তু এই মামলার জের ধরে প্রায় সাতমাস আব্বাসের পরিবার হেনস্তার স্বীকার হয় আর্থিক ও সামাজিক ভাবে।

প্রসঙ্গত, ‘তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় বলা আছে, ‘কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইটে বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ করেন, যা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেউ পড়লে, দেখলে বা শুনলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হতে উদ্বুদ্ধ হতে পারেন অথবা যার মানহানি ঘটে, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করতে পারে বা এ ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উসকানি দেওয়া হয়, তা হবে একটি অপরাধ। আইন অনুযায়ী, ৫৭ ধারার অপরাধ প্রমাণিত হলে ১৪ বছর কারাদণ্ড এবং ১ কোটি টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করতে পারবেন ট্রাইব্যুনাল’।

আইনের এই ৫৭ ধারা নিয়ে বিতর্ক সেই প্রথম থেকেই, কারণ এই ধারার নীতি এতোই ঢালাও যে,  যেকোনো মন্তব্যের জন্যই কিংবা আইনের অপব্যবহারের মাধ্যমে  যে কেউ হয়রানির শিকার হতে পারেন। সেক্ষেত্রে মামলার পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে, তবে অভিযোগের সত্যতার অভাবে আসামিরা অব্যাহতি পাচ্ছেন।

এ প্রসঙ্গে মানবাধিকারকর্মী শাহিদা বেগম বলেন, পুরো আইনটিই এখন ৫৭ ধারাকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। সরকারের আইনমন্ত্রী তাঁদের উদ্বেগের সঙ্গে সহমত পোষণ করে ৫৭ ধারা বাতিল বা সংশোধনের বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আশ্বাসও দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর সেই আশ্বাস আর পূরণ করা হয়নি।

উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে  তিনটি মামলা নিয়ে সাইবার অপরাধের বিচারের উদ্দেশ্যে সাইবার ট্রাইব্যুনালের কাজ শুরু হয়। পরের বছর ২০১৪ সালে মামলা আসে ৩২টি। ধারাবাহিকতায় বেড়ে ২০১৫ সালে ১৫২টি, ২০১৬ সালে ২৩৩টি। সর্বশেষ চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত আসা ৩৬৬টি মামলা নিয়ে ট্রাইব্যুনালে মোট মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছি ৭৮৬-তে।

এসব মামলার মধ্যে ২২২টি নিষ্পত্তি হয়েছে এবং বিচারাধীন ৫৬৫টি। এর বাইরেও প্রচুর মানুষ সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছে। তবে সামাজিক মর্যাদা এবং হুমকির ভয়ে তারা মামলা করা থেকে বিরত থাকছে। তার মধ্যে মূল অংশই নারী।

জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির আইনজীবী আয়েশা কুদ্দুস বলেন, ‘লজ্জা কিংবা অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের নিষেধাজ্ঞায় পড়ে নারীরা আইনের আশ্রয় নিতে অপরাগ হয়। সেক্ষত্রে অপরাধীরা সোচ্চার না হয়ে উল্টো অন্যায়ের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। শুধু নারী না, প্রত্যেক মানুষেরই উচিত সাইবার অপরাধের শিকার হলে আইনের আশ্রয় নেয়া উচিত। আর সাইবার অপরাধ নিয়ে করা আইন ও নীতি সম্পর্কে সঠিক ধারণা ও সচেতনটায় পারে সাইবার অপরাধের পরিমাণ কমিয়ে আনতে’।

Share.