রাজনীতির কবলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতকরা ৭৫ ভাগ শিক্ষক রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এটা দৃশ্যমান। বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট ১ হাজার ৯৯২ জন শিক্ষকের হাজার শিক্ষকই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত জাতীয় রাজনীতির প্রধান দুটি দলের সঙ্গে। তরুণ শিক্ষকরা রাজনীতি করেন অপেক্ষাকৃত ভালো থাকা, একটি বাসস্থান, স্কলারশিপের ছুটি, সিন্ডিকেট সদস্য হওয়ার জন্য। অনেকেই ইচ্ছার বিপরীতে রাজনীতির টেবিলে বসেন।

বয়োজ্যেষ্ঠ রাজনীতিক শিক্ষকদের লক্ষ্য থাকে প্রক্টর, প্রভোস্ট, ডিন, উপ-উপাচার্য, উপাচার্য, বিভিন্ন সংস্থা বা কমিশনের চেয়ারম্যান পর্যন্ত। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি দায়িত্বশীল পদে বসা শিক্ষকের সবাই জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। একজন প্রবীণ শিক্ষকের মন্তব্য, ‘শিক্ষক হতে অনেকে তদবিরের সময় একই রাজনীতির লোক বলে নিজেকে জাহির করে পরে অন্য দলে সুইংও করছেন। এমনসব বাস্তবতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ পড়ানোর মান ও গবেষণা কাজ দুই ক্ষেত্রেই দ্রুত অবনমন ঘটেছে। দেশের কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ই এমন অবস্থার বাইরে নয়। ’

সবকিছুতেই নির্বাচন : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক যে কোনো গুরুত্বপর্ণ পদে বসতে হলেই দরকার হয় নির্বাচনের। শিক্ষক রাজনীতির সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দেখা হয় এ ব্যবস্থাকেই। ১০টি অনুষদের ডিন, ৬ সিন্ডিকেট সদস্য, সিনেটের ৩৫ শিক্ষক প্রতিনিধি ও ২৫ রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধি, ৩ সদস্যের উপাচার্য প্যানেলের নির্বাচন সবকিছু ঘিরেই চলে জমজমাট শিক্ষক রাজনীতি।

জাতীয় রাজনীতির আদলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বিএনপি ও জামায়াত সমর্থক সাদা দল, আওয়ামী লীগ সমর্থক নীল দল এবং প্রগতিশীল ও বাম রাজনীতির প্রতি অনুরক্ত গোলাপি দল— তিন রঙে রাজনীতি করেন। জোট গঠনের মতো এখানেও জামায়াতের শিক্ষকদের জন্য নির্ধারিত কোনো অনুষদ, সিন্ডিকেট বা সিনেট পদ ছেড়ে দেওয়া হয়। একজন তরুণ শিক্ষক জানালেন, ‘সবকিছুই এখানে নির্বাচনকেন্দ্রিক হওয়ায় তাতে অংশ নিতে হলে প্রয়োজন পড়ে কোনো দলের সদস্য হওয়া। ’ তিনি বলেন, ‘গোলাপি দলে সুবিধা লাভের সুযোগ নেই বলে এখন তা নামমাত্র দলে পরিণত হয়েছে।

’ নির্বাচন ছাড়াও বিভিন্ন পদে চ্যান্সেলর মনোনয়নের বিষয়টিও পুরোমাত্রায় রাজনীতিনির্ভর। সরাসরি নীল অথবা সাদা, যে ক্ষমতায় থাকে চ্যান্সেলর তার আদর্শের শিক্ষকই মনোনয়ন করেন। যেমন এখন সিন্ডিকেটে চ্যান্সেলর মনোনীত ৩ জনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নীল দলের প্রথম সারির নেতা। একইভাবে সিনেটে চ্যান্সেলর মনোনীত ৫ জন শিক্ষাবিদের প্রত্যেকে নীল দলের। মনোনয়নে ভিন্নমতের কেউ এসেছেন এমন ব্যতিক্রম খুঁজে পাওয়া যায়নি একটি পদের ক্ষেত্রেও।

রাজনীতি না করলে কিছুই হওয়া যায় না : বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সিনিয়র শিক্ষক বললেন, ‘শিক্ষকরা কেন রাজনীতি করবেন না বলুন। রাজনীতি ছাড়া এখানে হলের আবাসিক শিক্ষক, প্রাধ্যক্ষ, সহকারী প্রক্টর, প্রক্টর, অনুষদের ডিন, সেন্টারের প্রধান, সিন্ডিকেট বা সিনেট সদস্য, উপ-উপাচার্য অথবা উপাচার্য কোনো কিছুই হওয়া সম্ভব নয়। বরং রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না থাকলে নানারকম বঞ্চনায় পড়তে হয় তরুণ ও বয়স্ক শিক্ষকদের।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১টি ইনস্টিটিউটের পরিচালক, ২৩টি আবাসিক হল ও হোস্টেলের প্রাধ্যক্ষ, ১০টি অনুষদের ডিন, ১৪টি সেন্টারসহ বিভিন্ন পদে আসীন সব শিক্ষক প্রত্যক্ষভাবে নীল ও সাদা দলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। হলের প্রাধ্যক্ষ একটি সুপরিসর বাসভবন ও দুজন কর্মচারী পান বলে এ পদে নিয়োগ নিয়ে উচ্চ মহলে তদবির পর্যন্ত হয়।

শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাজনীতির সিল (ছাপ) গায়ে না থাকলে এখানে বিপদই বেশি। কোনো দলের না হলে স্কলারশিপ, বিদেশে পড়তে যেতে কোনো শিক্ষক ছুটিও পাননি— অতীতে এমন ঘটনাও ঘটেছে। অপেক্ষাকৃত তরুণ শিক্ষকরা আবাসিক শিক্ষক হিসেবে কর্মরত থাকার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে পদোন্নতির পয়েন্ট যোগ করতে রাজনীতিতে আগ্রহী হন। উল্লেখ্য, প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য যে পয়েন্টের দরকার হয় তার ১ পয়েন্ট পাওয়া যায় আবাসিক শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা থেকে।

শিক্ষকতার শুরুতেই রাজনীতি : শিক্ষক হওয়ার পরে তো বটেই, এখন যারা শিক্ষক হচ্ছেন একাডেমিক যোগ্যতার চেয়েও তাদের সাদা অথবা নীলপন্থি হওয়ার পরিচয়টাই মুখ্য হয়ে উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক জানান, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ১৫ বছরে যে ৮ শতাধিক শিক্ষক নিয়োগ পেয়েছেন তার মধ্যে নীল বা সাদার প্রতি আনুগত্য দেখিয়েছেন অধিকাংশ জনই। যারা শুধু মেধা আর যোগ্যতাবলে শিক্ষক হয়েছেন তারাও নিয়োগলাভের প্রক্রিয়ার সময়টুকু অন্তত সরকারদলীয় মনোভাব দেখাতেই বাধ্য হয়েছেন।

’ সূত্র বলছে, অনার্স ও মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণিতে প্রথমসহ শিক্ষা জীবনের চারটি স্তরেই প্রথম বিভাগ/শ্রেণি ও পিএইচডি ডিগ্রি নিয়েও বিপ্লব কুমার দাস অন্য ধর্মের কারণে বিএনপির সময় ফার্মাসিউটিক্যাল কেমিস্ট্রির প্রভাষক হতে পারেননি। একইভাবে সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞানে চাকরি তো দূরের কথা, মনোনয়নই পাননি অনার্সে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম ও ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমফিল ডিগ্রিপ্রাপ্ত শতরূপা বড়ুয়া। সে সময় ‘আমি সাদা অথবা নীল কারও নই সেজন্য চাকরি হলো না’ বলে সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ জানান সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অনার্স ও মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়া মেধাবী শিক্ষার্থী ওমর ফারুক।

রাজনীতির যত সুবিধা : একটি দলের অনুগত হয়ে শিক্ষক রাজনীতি করলে জীবনে অনেক কিছুরই দেখা মেলে। রাজনীতির রং শক্তভাবে গায়ে লাগালেই আজ হোক বা কাল— একটা না একটা পদের দেখা মিলবেই। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতি করে প্রাপ্ত পদ-পদবির শেষ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব পদ-পদবি তো রয়েছেই, এর বাইরে বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি), বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি), ব্যাংকের চেয়ারম্যান বা সদস্য, বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান বা সদস্য, বাংলা একাডেমির সভাপতি, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, সিন্ডিকেট সদস্য, শিক্ষক নির্বাচনী বোর্ডের সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষক কমিটির সদস্য, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সরকারি বিশেষজ্ঞ হিসেবে মনোনয়ন প্রভৃতিও আছে। জাতীয় নির্বাচনে সরকার বদলালে এসব পদে শিক্ষক বদলায়। সাদা থেকে নীল অথবা নীল থেকে সাদায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি করলেও পদের অভাবে যারা এখানে কিছু না পান তাদের অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য করে পাঠানো হয়। যোগ্যতা একটাই— কঠোর দলীয় আনুগত্য।

রাজনীতির অসুবিধা : রাজনীতির কারণে শুধু সুবিধাই নয়, অসুবিধাও আছে। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর অনেকটা জোর করেই বিদায় করা হয় আওয়ামী লীগের শিক্ষক নেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক এ কে আজাদ চৌধুরীকে। শুধু উপাচার্য নয়, উপ-উপাচার্য, প্রক্টর, ১৫টি হলের প্রভোস্ট সব পদে পর্যায়ক্রমে আওয়ামী লীগপন্থি নীল দলের শিক্ষক সরিয়ে সাদা দলের শিক্ষক নেতাদের বসানো হয়। একই চিত্র ২০০৯-এ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর। উল্লিখিত সব জায়গায়ই এখন নীলের চূড়ান্ত আধিপত্য।

দলীয় আনুগত্যের বিবৃতিযুদ্ধ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হচ্ছে শিক্ষক সমিতি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষকই এখানকার সদস্য। শিক্ষক সমিতির নির্বাচনে বিজয়ী হতে নীল ও সাদার পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা তুঙ্গে ওঠে। উভয় পক্ষই দেখা করে আসে তাদের নেত্রীদের সঙ্গে। বিজয়ী হলে তারা আবার যায় নেত্রীর কাছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ শিক্ষক ও বিশিষ্ট লেখক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এক সেমিনারে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ নয়, যেন ভোটার নিয়োগ করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়সংশিষ্ট বা জাতীয় রাজনীতির কোনো ঘটনায় পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে রীতিমতো বিবৃতিযুদ্ধ শুরু হয় নীল ও সাদার মধ্যে।

যেমন ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নিলে তার সমালোচনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের নীল ও গোলাপি দলের ৩৮০ জন শিক্ষক পত্রিকায় বিবৃতি পাঠান। অন্যদিকে এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে সাদা দলের ৪৪৫ জন শিক্ষক পাল্টা বিবৃতি পাঠান।

Loading...