চট্টগ্রাম

নোয়াখালীতে মিলন হত্যার ৭ বছর: বিচার মাটিচাপা দিল পুলিশ!

মোঃ ইমাম উদ্দিন সুমন, সময়ের কণ্ঠস্বর: দীর্ঘ ৩৩ মাসেও নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের কিশোর শামছুদ্দিন মিলন (১৬) হত্যা মামলার ‘অধিকতর তদন্ত’ শেষ করতে পারেনি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। ২০১৫ সালের ৫ নভেম্বর ডিবি-পুলিশের দাখিল করা মিলন হত্যা মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ না করে মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত।

গত বছরের ২৬ জুলাই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার (বর্তমানে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, কুমিল্লা ও নোয়াখালী জোন) জালাল উদ্দিন আহম্মদ জানিয়েছিলেন, মামলার তদন্তে অল্প কিছু কাজ বাকি আছে, যা শেষ করতে দু-তিন মাস সময় লাগবে। এরপরই আদালতে প্রতিবেদন দেওয়া হবে। কিন্তু এরই মধ্যে আরও ১২ মাস পেরিয়ে গেলেও জমা হয়নি প্রতিবেদন। তদন্তে সিআইডির এই কালক্ষেপণে হতাশ মামলার বাদীসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো।

‘ডাকাত সাজিয়ে’ মিলনকে পিটিয়ে হত্যার সাত বছর পূর্ণ হল শুক্রবার। ২০১১ সালের ২৬ জুলাই কোম্পানীগঞ্জের চরকাঁকড়া এলাকায় কিশোর মিলনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পুলিশ গাড়িতে করে নিয়ে উন্মত্ত জনতার হাতে ছেড়ে দেয় তাকে। পুলিশের উপস্থিতিতেই মিলনকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পরে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। পুলিশের গাড়ি থেকে নামিয়ে দেওয়াসহ পুরো ঘটনাটির ভিডিও চিত্র প্রকাশিত হলে স্তম্ভিত হয়ে পড়ে প্রশাসনসহ সাধারণ মানুষ।

৩৩ মাসেও তদন্ত প্রতিবেদন দিতে না পারা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সিআইডি, নোয়াখালী ও কুমিল্লা জোনের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জালাল উদ্দিন আহম্মদ বৃহস্পতিবার দুপুরে বলেন, ‘ঘটনার খুঁটিনাটি দিক তদন্ত করতে গিয়ে বেশি সময় লেগেছে। বর্তমানে তদন্ত শেষ পর্যায়ে। পুলিশ সদস্যদের হত্যা মামলায় সম্পৃক্ত করা হবে কি না, এ বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে শিগগিরই সিদ্ধান্ত হতে পারে।’ তবে মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন নয়, অভিযোগপত্রই দেওয়া হবে বলে জানান এই কর্মকর্তা।

সিআইডির একটি সূত্রে জানা গেছে, মিলন হত্যা মামলার তদন্ত অনেক আগেই শেষ হয়েছে। ডিবি-পুলিশের তদন্তে ভিডিও চিত্র দেখে হত্যার ঘটনায় যাঁদের শনাক্ত করা হয়েছে, তাঁদের সবাই (মৃত ব্যক্তিরা ছাড়া) এই মামলায় অভিযুক্ত হবেন। এর বাইরে ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশ সদস্যদের ফৌজদারি এই মামলায় আসামি করা হবে কি না, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সে সিদ্ধান্ত না পাওয়ায় আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলে দেরি হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে নোয়াখালী জেলা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি এ টি এম মহিব উল্যাহ বলেন, ‘তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলে আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও ম্যাজিস্ট্রেটের কাছ থেকে সময় নেওয়ার সুযোগ আছে। কিন্তু সিআইডি এই মামলা তদন্তে দীর্ঘ সময় নিচ্ছে, এটি অনভিপ্রেত।’

২০১৫ সালের জুলাই মাসের প্রথম দিকে মিলন হত্যা মামলায় আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছিলেন তদন্তকারী কর্মকর্তা (ডিবি) আতাউর রহমান ভূঁইয়া। তিনি ছিলেন ওই মামলার তৃতীয় তদন্ত কর্মকর্তা। প্রতিবেদনে তিনি হত্যাকাণ্ডের ভিডিও চিত্র দেখে শনাক্ত হওয়া ২৯ জন এবং ঘটনাস্থলে থাকা তিন পুলিশসহ ৩২ জন আসামিকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আবেদন করেন। চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বাদী মামলা চালাতে চান না বলে আদালতে দায়ের করা আবেদনে উল্লেখ করা হয়। এ নিয়ে ওই বছরের ২৭ জুলাই ‘বিচার মাটিচাপা দিল পুলিশ’ শিরোনামে প্রতিবেদন ছাপা হওয়ার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। পরে ৫ নভেম্বর ২ নম্বর আমলি আদালতের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম ফারহানা ভূঁইয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ না করে মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেন।

মিলন হত্যার পর জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিক উল্লাসহ চার পুলিশ সদস্যকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। কিছুদিন পরই তাঁরা আবার নিজ পদে ফিরে আসেন। চার পুলিশ সদস্যের মধ্যে পরিদর্শক রফিক উল্লাহ বর্তমানে বান্দরবানের আলীকদম থানার ওসি, এসআই আকরাম হোসেন শেখ বাগেরহাটের মোংলা থানায়, আর কনস্টেবল হেমারঞ্জন চাকমা ফেনী, আবদুর রহিম চাঁদপুর জেলায় কর্মরত আছেন।

জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মিলন হত্যার ঘটনায় তিন পুলিশ সদস্যকে বিভাগীয় মামলায় পৃথক দণ্ড দেওয়া হয়। এর মধ্যে এসআই আকরাম হোসেন শেখকে তিন বছরের জন্য এবং কনস্টেবল হেমারঞ্জন চাকমা ও আবদুর রহিমের দুই বছরের জন্য স্থায়ীভাবে বেতন বৃদ্ধি স্থগিত করা হয়। সূত্রের মতে, এটি পুলিশের আইনে ‘গুরুদণ্ড’ হিসেবে ধরা হয়।

মিলনের মা কোহিনুর বেগম বলেন, ‘এসআই আকরাম আমার স্বামীকে বৈধভাবে বিদেশে পাঠানো এবং ছেলেকে পুলিশে চাকরি দেওয়ার কথা বলে সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরিয়ে আনেন। কিন্তু স্বামীকে বিদেশে পাঠানো হয়নি, ছেলেরও চাকরি হয়নি। আয়রোজগার বন্ধ হওয়ায় সংসার অচল হয়ে যায়। এসব কারণে দুশ্চিন্তায় অসুস্থ হয়ে গত বছরের মার্চে মিলনের বাবাও মারা যান।

আরো দেখুন
Close
Close