এলএনজি আমদানির প্রভাব অর্থনীতিতে কতটা ?

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

প্রাকৃতিক গ্যাসের বিকল্প হিসেবে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে বাংলাদেশ। বর্তমানে প্রতিদিন ৩৭৩ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে ২৭৫ কোটি ঘনফুট। ঘাটতি মেটাতে ২০১০ সালে এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নেয় সরকার।

অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, উত্স জ্বালানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ গ্যাসের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। তাই এই অবস্থায় আমদানি করার বিকল্প নেই। আমদানির সঙ্গে সঙ্গে বিকল্প উপায়গুলো নিয়েও ভাবতে হবে বলে মনে করছেন তাঁরা। তবে জ্বালানি বিশ্লেষকেরা বলছেন, চড়া দামের এলএনজি আমদানির কারণে সার্বিকভাবে উচ্চমূল্যের গ্যাসের দিকে যাচ্ছে বাংলাদেশ। পক্ষান্তরে যার একটি নেতিবাচক প্রভাবই পড়বে দেশের অর্থনীতিতে। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে তীব্রভাবে পিছিয়ে পড়বে বাংলাদেশ। এদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, যেভাবেই সরবরাহ হোক না কেন দাম সামর্থ্যের মধ্যে থাকতে হবে।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর প্রথম আলোকে বলেন, ২০২৫ সাল নাগাদ দেশে আর মজুত গ্যাস থাকবে না বলেই বলা হচ্ছে। দেশের গ্যাস ফুরিয়ে আসছে। এই মুহূর্তে নতুন গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনাও নেই। গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধান করা যাচ্ছে না। কয়লা রাজনৈতিক কারণে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে আমদানি ছাড়া গতি নেই।

তিনটি উপায় আছে জ্বালানি সমস্যা সমাধানে। গ্যাস ও কয়লা আমদানি এবং সরাসরি বিদ্যুৎ আমদানি। আহসান এইচ মনসুর বলেন, চাল, গম আমদানি করা গেলে বিদ্যুৎ কেন ভারত থেকে আমদানি করা যাবে না। ভারতে এখনো বিদ্যুতের দাম কম। আমাদের এই উপায়টা ব্যবহার করতে হবে। গ্যাস, কয়লা, বিদ্যুৎ এই তিন খাতকে একসঙ্গে প্রাধান্য দিলে আমদানি করলেও ভোক্তা লাভবান হবেন।

তবে এ ক্ষেত্রে পুরো আমদানিপ্রক্রিয়া বিকেন্দ্রীকরণ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, গ্যাসের আমদানি থেকে সরবরাহ সব পর্যায়ে বেসরকারীকরণ করা প্রয়োজন। সরকার কেবল পাইপলাইনের চার্জ নেবে। সংস্কার করবে। তাহলে সাশ্রয়ী মূল্যে গ্যাস পাবে ভোক্তা।

গ্যাস আমদানির বিষয়টি যুক্তিযুক্ত জানিয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এলএনজি আমদানির কারণে দাম অবশ্যই বাড়বে। তবে বর্তমানে গ্যাসের দাম যেভাবে নির্ধারিত হয়ে আছে, সেভাবে তো আর চলবে না। দেখতে হবে গ্যাস আমদানিতে যে বিনিয়োগ করা হচ্ছে, তা আমাদের জন্য কতটা সাশ্রয়ী হবে?

এ ক্ষেত্রে দীর্ঘ মেয়াদে নিজেদের মজুত বাড়ানোর বিষয়ে জোর দেন মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, সমুদ্রসীমায় অনুসন্ধান বাড়াতে হবে। আমাদের মজুত আর আমদানির মাধ্যমে একটি ভারসাম্যপূর্ণ গড় খরচ হবে। গ্যাসের চাহিদা কোন শিল্প খাতে বেশি কোনটাতে কম, এটা নির্ধারণ করে দাম সমন্বয় করতে হবে। এ ছাড়া শিল্প খাতে উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে দাম পোষাতে হবে।

তবে আমদানির বিকল্প নেই-এ বিষয়ে একমত নন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, অর্থনীতিতে স্পষ্টতই একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বদরুল ইমাম বলেন, সরকার বিরাট আকারে এলএনজি আমদানির যে পরিকল্পনা করেছে, তা অর্থনীতিকে একটি ‘শক’ দেবে। তিনি বলেন, ‘বর্তমান অবস্থায় স্বল্প মেয়াদে অল্প পরিমাণ আমদানি করা যেতে পারে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জাপান, কোরিয়ার মতো উন্নত দেশগুলো এই আমদানির পরিকল্পনা করতে পারে। কিন্তু আমাদের মতো দেশের জন্য এই বড় বাজেটের জ্বালানি আমদানি কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করবে। শিল্পপণ্যের দাম বাড়বে।’

বদরুল ইমাম আরও মনে করেন, ‘এলএনজির বিকল্প বাংলাদেশের সামনেই ছিল। ২০১২ সালে মিয়ানমারের কাছ থেকে আমরা যে সমুদ্রসীমা জয় করেছি, অনুসন্ধান চালালে সেখানে নিয়মিত গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। মিয়ানমার আমাদের বর্ডারের কাছেই গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করেছে। অর্থাৎ পাশেই আমাদের গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের সম্ভাবনা ছিল। এ ক্ষেত্রে শক্তিশালী ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের প্রয়োজন ছিল।’

সরকারি তথ্যমতে, ২০২৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশের এলএনজি আমদানির পরিমাণ দাঁড়াবে ১ কোটি ৭৫ লাখ টনে।

জ্বালানির বহুমুখীকরণের প্রয়োজনীয়তা জানিয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বলেন, ‘আমাদের দেখা প্রয়োজন ছিল জ্বালানির ব্যয় যেন আমাদের সামর্থ্য ছাড়িয়ে না যায়। আমাদের নিজস্ব দাম এখন আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাড়ানো হচ্ছে। তার ওপর এলএনজি আমদানি হলে সরবরাহ বাড়লেও দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে না। আমরা শিল্পক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ব।’

শামসুল আলম বলেন, জ্বালানি প্রাপ্যতাকে জ্বালানি নিরাপত্তা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। ইন্ডিয়ান ওয়েল করপোরেশন (আইওসি) সারা বিশ্বে এলএনজি রপ্তানি করতে চাচ্ছে। ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে চাচ্ছে। আর এ ক্ষেত্রে আমাদের মতো সংকটপূর্ণ দেশগুলোতে সরবরাহ করে ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে চাইছে। আমাদের প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। অথচ অন্য জ্বালানি আমদানি করে ব্লেন্ডিং করে আমরা দাম কমাতে পারতাম।

তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, যেভাবেই গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হোক না কেন দাম যেন সামর্থ্য অনুযায়ী হয়, সেটাই বড় কথা।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, ‘গ্যাস সংকটের কারণে প্রতিদিনই শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। গ্যাসের প্রয়োজন। আমাদের মজুত ও আমদানি করে দাম সমন্বয় করতে হবে। সর্বশেষ কথা, সামর্থ্যপূর্ণ দাম না হলে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে বাংলাদেশ।’

ফেসবুক মন্তব্য
Share.